হ্যাঁ, আমিও ভুল লিখছি না এবং আপনিও ভুল পড়ছেন না!

ইরফানুর রহমান রাফিন

২০১৬ শুরু করলাম একটি ভালো কাজ দিয়ে। শাহবাগে চা-শ্রমিকদের কৃষি জমি রক্ষা সংহতি কমিটির সমাবেশ ছিলো, গেলাম, অনেকদিন পর অনেক কমরেডের সাথে দেখা হল। বড় কোনো মিডিয়ার উপস্থিতি চোখে পড়লো না। না পড়াটাই স্বাভাবিক। চা-শ্রমিকরা সমাজের প্রান্তিকতম অবস্থানে থাকা দরিদ্রতম মানুষ। মিডিয়ার চোখে এদের আন্দোলনের নিউজ ভ্যালু সামান্যই। যতোক্ষণ পর্যন্ত তাঁরা নিজেদের গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়ে একজন একজন করে সুইসাইড না করছেন, খুব সম্ভবত, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই ভ্যালু তৈরিও হবে না।

lrg20160109133435

একটি লিফলেট পেলাম। আমার মনে হয় লিফলেটটি আপনাদের পড়া উচিত। পুরোটা তুলে দিতে পারলে হয়তো ভালো হত, সেটা সম্ভব না, তাই লিফলেটের মূল বক্তব্য সংক্ষেপে বিবৃত করছি। একজন চা-শ্রমিক দৈনিক ২৩ কেজি চা-পাতা তুলে মজুরি পান ৬৯ টাকা, অর্থাৎ, তাঁর মাসিক মজুরি ২০৭০ টাকা। হ্যাঁ, আমিও ভুল লিখছি না এবং আপনিও ভুল পড়ছেন না, একজন চা-শ্রমিকের মাসিক মজুরি হচ্ছে ২০৭০ টাকা। আমরা অনেকে প্রতি মাসে শুধু যাতায়াত বাবদ যেই টাকা খরচ করি সেই টাকায় তাঁদেরকে সংসার চালাতে হয়, যেটা সম্ভব নয়, আর তাই তাঁদের শেষ ভরসা চাষের জমি।

ব্রিটিশ শাসকরা আজ থেকে দেড়-দুইশো বছর আগে চা-বাগান তৈরির পরিকল্পনার সময় ভালো কাজ আর ভালো থাকার লোভ দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দরিদ্র মানুষদেরকে এখানে নিয়ে এসেছিলো। তখন এই চা-শ্রমিকরা জঙ্গল কেটে এই চা-বাগানগুলো তৈরি করেছেন এবং চা-বাগানের মধ্যকার অব্যবহৃত জমি মেলা মেহনত করে কৃষির উপযোগী করে তুলেছেন। মহাজোট সরকার তাঁদের এই কৃষি-জমিটুকুকে কাগজে কলমে অকৃষি-জমি হিসেবে দেখিয়ে স্পেশাল ইকোনমিক জোনের নামে দখল করতে চাচ্ছে।

চা-শ্রমিকদের সম্মতির কোনো তোয়াক্কা করেনি। আর ক্ষতিপূরণ প্রদানের তো প্রশ্নই আসেনি। কারণ আগেই লিখেছি, চা-শ্রমিকরা সমাজের প্রান্তিকতম অবস্থানে থাকা দরিদ্রতম মানুষ, রাষ্ট্র তাঁদেরকে মানুষ বলেই গণ্য করে না। সমাজের স্বচ্ছলতর অংশের চোখেও তাঁরা করুণার পাত্র। তাই গত ১৩ই ডিসেম্বর থেকে হবিগঞ্জের চুনারঘাটের চান্দপুর চা-বাগানের শ্রমিকরা প্রতিদিন তাঁদের কাজ বন্ধ রেখে প্রতিবাদ করছেন।

পৃথিবীর সবচেয়ে কম মজুরিপ্রাপ্ত এই চা-শ্রমিকদেরকে তাঁদের জমির অধিকার দেয়ার কথা বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালে শেখ মুজিব তাঁদেরকে অধিকারের আশ্বাস দিয়েছিলেন, ১৯৯৬এ আওয়ামি লিগ তাঁদেরকে মালিকানা ও বাঁচার ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছিলো। ১৯৭১এ এই চা-শ্রমিকরা যুদ্ধ করেছেন, জীবন দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ তাঁদের জীবনে কোনো অর্থ বহন করে নি, যুদ্ধের আগেও তাঁরা উপনিবেশবাদী শোষণের শিকার হয়েছেন, যুদ্ধের পরেও পরিস্থিতি একই থেকেছে।

চুনারঘাটের এই চা-বাগানে মোট জমি ৩৯৫১ একর, এর মধ্যে চাষের জমি ৯৫১ একর, এর থেকে ৫৫১ একর কৃষি-জমিকে অকৃষি-জমি হিসেবে দেখিয়ে এসইজেড নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে। এই জমিতে বছরে দুটি ফসলের চাষ হয়। চা-বাগানের মালিক ডানকান শ্রমিকদের মজুরি বাড়াতে নারাজ, শ্রমিকদের জমি কেড়ে নেয়ার ব্যাপারেও তাঁদের মাথা ব্যথা নেই, তাঁরা পত্রিকায় জানিয়েছে তাঁরা নাকি এই বরাদ্দ সম্পর্কে কিছুই জানে না। সরকার বলছে “শিল্পায়ন” হলে শ্রমিকরা কাজ পাবে।

এর আগে একই কথা বলে রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্রের জন্য রশিদপুর চা-বাগানের শ্রমিকদের এবং স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য লাক্কাতুরা চা-বাগানের শ্রমিকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ধানের জমি দখল করা হয়েছিলো। শ্রমিকরা কোনো ক্ষতিপূরণ পান নি, এবং, প্রকৃত শিল্পায়নে যে ব্যাপক কর্মসংস্থান হওয়ার কথা তার কিছুই হয় নি। দুষ্ট লোকের মিষ্ট কথায় ভুলতে হয় না, শ্রমিকরা ঠেকে শিখেছেন, এতো তাড়াতাড়ি সেই শিক্ষা ভুলে যাবেন তাঁরা?

চা-শ্রমিকরা চাষের জমি রক্ষা করতে মরিয়া কেনো? কারণ আগেই লিখেছি, শুধু মজুরিতে সংসার চলে না, এই চাষের জমি থেকে উৎপাদিত ফসলে সংসার চলে তাঁদের। চা-বাগানে কাজ পান নি, এমন অনেক পরিবার, কোনোক্রমে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকেন এই জমির ওপর নির্ভর করেই। কথিত উন্নয়ন এঁদেরকে সমূলে উচ্ছেদ করতে চায়। বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে, বিশেষত এই নিওলিবারাল জামানায়, কথিত উন্নয়নের অভিজ্ঞতা এখন পর্যন্ত এটাই।

তদুপরি ১৯৯৭ সালের সংশোধিত কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা অনুযায়ী দেশের সকল মেট্রোপলিটান এলাকা, সকল পৌর এলাকা এবং সকল জেলা/উপজেলা সদর এলাকার বাইরের সকল প্রকার কৃষিযোগ্য খাসজমিই কৃষি-খাসজমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ এই এসইজেড নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরুই হয়েছে মিথ্যাচারের মাধ্যমে, আইন অনুসারে যা কৃষি-জমি তাকে অকৃষি-জমি দেখিয়ে, বোঝাই যাচ্ছে উন্নয়ন আর শিল্পায়নের দোহাই দিয়ে দখলদারিত্বের আসল উদ্দেশ্যটা কি!

আরো কথা আছে। চা-খাতকে শিল্প বলা হলেও এটি মূলত কৃষি-সম্পর্কিত। তদুপরি চা-শ্রমিকরা শিল্প-শ্রমিক হিসেবে কোনো সুযোগ-সুবিধা এযাবৎকালে পান নি এবং অদূর ভবিষ্যতে পাবেন এমন কোনো সম্ভাবনাও নেই। তাঁরা উত্তরাধিকারসূত্রে চাষের জমি ভোগ করে আসলেও আইনের চোখে ভূমিহীন, এবং এই কারণেই, তাঁদের কাছ থেকে এসইজেড নির্মাণের নামে জমি দখল করার প্রকল্প এতো সহজে নেয়া গেছে। অথচ কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালাতেই কৃষি-জমি বন্দোবস্ত প্রদানের নিয়ম/বিধি দেয়া আছে।

আইন অনুসারে ভূমিহীন প্রতিটি পরিবার দুই ফসলী জমি হিসেবে মোট ১.০৫ একর জমি বন্দোবস্ত হিসেবে পেতে পারেন। এমত অবস্থায় কমিটির ন্যুনতম দাবী হচ্ছে তিনটিঃ

১. অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের নামে কৃষিজমিতে অবৈধ শিল্পায়ন করা চলবে না।
২. কৃষিজমিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের উদ্দেশ্যে এযাবতকালে প্রদত্ত সকল বরাদ্দ বাতিল করতে হবে।
৩. বাস্তুহীন, ভূমিহীন চা-শ্রমিকদের কৃষি-খাসজমি আইন অনুযায়ী চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দিতে হবে।

আন্দোলনকারীরা বলছেন তাঁরা ইকোনো জোন বোঝেন না, চাষের জমি তাঁরা কেড়ে নিতে দেবেন না, এটা সাফ কথা। তাঁরা তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছেন যে আমাদের শাসকগোষ্ঠী কি পরিমাণ ক্রিমিনাল ও লুম্পেন, এবং, এই শাসকগোষ্ঠীর কাছে উন্নয়ন আর শিল্পায়ন যে লুণ্ঠন আর দখলদারিত্বের প্রতিশব্দ ছাড়া আর কিছুই নয় সেটা তাঁরা জানেন। চা-শ্রমিকদের কৃষি জমি রক্ষা সংহতি কমিটির দাবী তিনটি, আমি মনে করি, তাঁদের চলমান আন্দোলনের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবে আপনাদের কাছে আমার আরেকটি আর্জি আছে। সেটি হচ্ছে চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিটাও তোলা। মাসিক ২০৭০ টাকা মজুরি একটা নির্মম রসিকতা। ইউনিলিভারের ভ্যাসলিন কয়েকদিন আগে রিকশাঅলাদেরকে হতদরিদ্র হিসেবে চিত্রায়িত করে তাঁদের প্রতি করুণা করার আহবান জানিয়েছে শাহরিক মধ্যবিত্তকে। অথচ শাহরিক মধ্যবিত্ত, আপনারা কি জানেন, ঢাকা শহরের একজন রিকশাঅলার মাসিক আয় একজন চা-শ্রমিকের মাসিক আয়ের চেয়ে প্রায় ৮ থেকে ১০ গুন বেশি? এই রিপ্রেজেন্টেশনের রাজনীতির খেলাটা কি বুঝতে পারেন? করুণার চশমাটা খুলে কমপ্যাশনের চোখ দিয়ে দেখলে সেটা বুঝে নিতে সুবিধা হবে আপনাদের।
হ্যাপি নিউ ইয়ার।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*