বাংলার প্রাক-ঔপনিবেশিক শিল্পকলা

আদিত্য মাহমুদ।।

বাংলায় চিত্রকলার বিকাশ ঘটেছে প্রাচীনকালে। বাংলা তথা ভারতীয় শিল্পে নানা বৈশিষ্ট্যের শিল্পের দেখা পাওয়া যায়। মূলত সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শক্তির উত্থান-পতনের ওপর নির্ভর করে বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন ঘটেছে। বৌদ্ধযুগ, পালযুগ, সেনযুগ, মুসলিম যুগ এবং ইংরেজ আমল সব যুগেই শাসক শ্রেণীর বৈশিষ্ট্যসূচক শিল্পের প্রাধান্য লক্ষ্যণীয়। শাসকশ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতায় এসব শিল্পচর্চা করা হতো। এ ধরনের শিল্পীরা রাজশিল্পী বা দরবারি শিল্পী নামে পরিচিত। এর বিপরীতে আরেক দল শিল্পীর দেখা মেলে। যাদের বলা হয় লোকশিল্পী। ভারতবর্ষের প্রাচীন শিল্পের ঐতিহ্যের ধারার সন্ধান পাওয়া যায় মূলত এসব লোকায়ত শিল্পীদের সৃষ্ট শিল্পকর্মের মাঝে। বাংলার সাধারণ মানুষের জীবন বিশ্বাস ও প্রচলিত লোকগাথাসমূহকে এসব লোকশিল্পীরা তাদের শিল্পকর্মে বহন করে চলেছেন আবহমানকাল থেকে। এসব লোকশিল্পী পটুয়া নামে পরিচিত। বৌদ্ধ সাহিত্যে এসব লোকশিল্পীকে বলা হয়েছে শৌভিক। এ ছাড়া প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যেও এদের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। তবে মজার কথা হল, পৃথিবীর অন্য যে কোনো স্থানের চেয়ে বাংলায় দরবারি ও লোকশিল্পের পার্থক্য তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এ অঞ্চলের সামগ্রিক গ্রামীণ চরিত্রই ছিল এর প্রধান কারণ।

প্রাক-ঔপনিবেশিক শিল্পকলা বলতে মূলত মুসলমানদের বাংলা অধিকারের পূর্ববর্তী শিল্পকলাকে বোঝানো হয়ে থাকে। বাংলার প্রাচীন শিল্পের বিশেষ করে চিত্রশিল্পের নিদর্শন তেমন একটা পাওয়া যায় না। পাল আমলের মধ্যভাগ পর্যন্ত মূলত তালপাতা, কাপড় ও কাঠের ওপর চিত্রকর্ম করা হতো। এসব মাধ্যমের স্থায়িত্ব কম হওয়ায় সেসব চিত্রকর্ম সংরক্ষণ করতে না পারার প্রধান কারণ। বৌদ্ধ বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে ক্ষুদ্রাকৃতির বৌদ্ধ মূর্তি এবং নানা দেব-দেবীকে বিচিত্রভাবে অাঁকা হয়েছিল। প্রথম দুইশত বছরের চিত্রশিল্পের নিদর্শন পাওয়া যায় খবুই অল্প। দশম শতকের শেষভাগের কিছু চিত্রকলার নিদর্শন পাওয়া যায়। পাল আমলের এসব পা-ুলিপিতে দুই ধরনের চিত্রকর্মের দেখা পাওয়া যায়। পুঁথির কাহিনীর বর্ণনার সঙ্গে সহায়ক হিসেবে চিত্র ব্যবহার করা হতো এবং পুঁথির প্রচ্ছদ হিসেবে কাঠের ওপর খোদাই করে চিত্র অঙ্কিত হতো। তবে রীতি ও শৈলীতে এগুলো ছিল অভিন্ন। এসব চিত্রশিল্পের প্রকাশভঙ্গি ছিল বেশ নান্দনিক। বুদ্ধিবৃত্তিক শিল্প বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এসব পুঁথিচিত্র মানের দিক থেকে ভারতীয় ধ্রুপদী অজান্তার মার্গরীতির সমপর্যায়ের। পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের দ্বারা বাংলা আক্রান্ত হওয়ার ফলে এবং বৌদ্ধমন্দিরসমূহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় এসব চিত্রকর্মের বড় অংশ হারিয়ে যায়; নষ্ট হয়ে যায়।

634756363036388184-the-love-affair

চিত্রকর্মের পাশাপাশি বাংলার প্রাচীন ভাস্কর্য শিল্পের নিদর্শনও কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। কাদামাটির সঙ্গে পাথরের কুচি মিশিয়ে মূর্তি তৈরি হতো। বগুড়ার মহাস্থানগড়ে এর সামান্য কিছু নিদর্শন পাওয়া যায়। তবে এর পাশাপাশি বাংলায় ব্যাপকভাবে নির্মিত হতো কষ্টিপাথরের মূর্তি। এই মূর্তিগুলোর অধিকাংশই নবম থেকে দ্বাদশ শতকে পাল ও সেন আমলে নির্মিত। তবে বঙ্গীয় সমতল এলাকায় পোড়ামাটির শিল্পের প্রচুর নিদর্শন পাওয়া যায়। এগুলো টেরাকোটা নামে পরিচিত।

খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে পোড়ামাটি নির্মিত কিছু শিল্পের নিদর্শন পাওয়া যায় মহাস্থানগড়ে। এছাড়াও খ্রিস্ট-পরবর্তী অষ্টম ও নবম খ্রিস্টাব্দে নির্মিত পোড়ামাটির শিল্পের নিদর্শন পাওয়া যায় পাহাড়পুর ও ময়নামতিতে। তবে এ সময়ের মাঝে এসব শিল্পকর্মের বৈশিষ্ট্যগত কিছু বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। মহাস্থানগড় ছিল টেরাকোটা শিল্পের বিকাশমান কেন্দ্র। এখানকার টেরাকোটায় পাল যুগের শিল্পরীতির বৈশিষ্ট্যের প্রাধান্য দেখা যায়। তবে খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে সুঙ্গ আমলে নির্মিত টেরাকোটা যক্ষী মূর্তিগুলো মহাস্থানের নান্দনিক ভাস্কর্যশিল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য বহনকারী হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া ময়নামতিতে অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত বৌদ্ধবিহারসমূহে উৎকৃষ্ট শিল্পনিদর্শন পাওয়া যায়। এখানকার পোড়ামাটির ফলকগুলোতে শিল্পীরা চলমান সমাজ জীবনের নানাদিক বিস্তারিতভাবে রূপায়িত করেছেন। বাংলার লোকায়ত শিল্পের সর্বোত্তম নিদর্শন হচ্ছে এসব টেরাকোটা ফলক। ফলকগুলোতে বৌদ্ধ ও হিন্দু দেবদেবী, রামায়ণ, কৃষ্ণ কাহিনীর পাশাপাশি সমাজের নানা শ্রেণী-পেশায় নিয়োজিত মানুষের জীবন বিচিত্র ও ভঙ্গীমায় তুলে ধরা হয়েছে। এসব শিল্পকর্মের প্রকাশভঙ্গী অত্যন্ত সরল। গ্রামীণ জীবনের বৈচিত্র্যতা টেরাকোটায় রূপায়িত হয়েছে অপূর্ব ছন্দে।
বিস্তীর্ণ ভারতবর্ষের ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক ধর্মীয় এবং ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ভিন্ন ভিন্ন স্বতন্ত্র শিল্প বৈশিষ্ট্যের জন্ম দিলেও এদের মাঝে একটি ঐক্যসূত্র বিদ্যমান। ভারতের ধ্রুপদী অজান্তা চিত্রকর্মের সঙ্গে বাংলার ঐতিহ্যগত ক্ষুদ্রকার অনুচিত্রগুলোর আঙ্গীকেও কৌশলগত সাদৃশ্য রয়েছে। তাছাড়া বাংলার এসব শিল্পকর্মে তিব্বতি রীতির ছোঁয়া পাওয়া যায়।

সমাজজীবনের সামগ্রিক চরিত্র বাংলায় লোকশিল্পের একটি শক্তিশালী ধারার জন্ম দিয়েছিল। বাংলা ভারতীয় সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির উত্তরসূরি হলেও একথা বেশ জোর দিয়ে বলা চলে, আদর্শগত ও নান্দনিকতার দিক থেকে এ অঞ্চলের শিল্পকর্ম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*