আমি কোনও ভালোবাসার গল্প জানি না…

স্বাধীনতা, গণতন্ত্র,ভালোবাসা-এ শব্দগুলোর অর্থ আকাশের মতো বিশাল। অথচ দিন দিন শব্দগুলো নিছক চারটি শব্দের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফেব্রুয়ারি মাস আমাদের জন্য; বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সংগ্রামের মাস। আমরা ১৯৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারিতে যেমন ভাষার দাবিতে প্রাণ দিয়েছি,তেমনি ১৯৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারিতেও শিক্ষার দাবিতে দিয়েছি গরম তাজা রক্ত। গোলাপ বা কৃষ্ণচূড়ার রঙের মতোই রক্তলাল হয়ে গিয়েছিল রাজপথ। যে রক্তের স্রোতের ধারাবাহিকতাতেই ১৯৯০ এ সামরিক স্বৈরতন্ত্রের পতন হয়। সেই সংগ্রামের ইতিহাস আমরা কতজন জানি বা জানতে দেওয়া হয় আজকের তরুণ প্রজন্মকে?  সেই রক্তাক্ত ইতিহাস ও বতর্মান প্রেক্ষিত নিয়ে লিখেছেন শারমিন রহমান ও আরশাদ আলী।

19

সারা বিশ্বের মতো ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালনের জন্য উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করে এখনকার প্রজন্ম। এ দিনটিকে আরও ব্যবসা সফল করার জন্য মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারক ও বাহকরা ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে পসরা সাজিয়ে বসে। ভালোবাসা দিবসের আগে ৭ ফেব্রুয়ারি রোজ ডে, ৮ ফেব্রুয়ারি প্রপোজ ডে…১৩ তারিখ কিস ডে। এরপর ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন ডে।

রাজপুত্রের একার সুপারম্যান সদৃশ ক্ষমতা নয়, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় সামষ্টিক শক্তিকে সম্বল করে স্বশস্ত্র রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে খালিহাতে লড়েছিল তারা। তাদের হাতিয়ার ছিল সমষ্টির ভালোবাসা,জনগণের স্বার্থের প্রতি ভালোবাসা। আমরা কি আজ পারি সেভাবে সমষ্টিকে ভালবাসতে, নিজেকে ভালবাসতে?

ফেব্রুয়ারি মাস জুড়েই চলে কোটি কোটি টাকার ফুল ও বিভিন্ন রকমারি উপহার সামগ্রী বিক্রির রমরমা ব্যবসা। মুদ্রণ ও প্রচার মাধ্যমগুলোতেও থাকে বিশেষ আয়োজন। ন্যাকামো ভাষায় ন্যাকা ন্যাকা প্রেমের কথন,পত্রিকার পাতা ও টিভির পর্দাজুড়ে থাকে প্রথম ভালোবাসার রোমাঞ্চকর কাহিনী। দিনটির সকাল-সন্ধ্যা-অপরাহ্নের সাজ কেমন হবে, তা নিয়ে থাকে পত্রিকার বিশেষ বুলেটিন। সঙ্গে থাকে ডিসকাউন্টের দারুন সব অফারের মহোৎসব। কনসার্টের নামে রাতভর চলে হৈ-হল্লা। ভালোবাসা প্রকাশের অধীরতায় কেউ কেউ প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার কর্মসূচীরও ডাক দেন। যেন প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার মধ্য দিয়েই রাজপুত্ররা রূপকথার ডাইনির সঙ্গে ভীষণ যুদ্ধ করে জয়ী হয়ে রাজকন্যদেরকে উদ্ধার করবে এবং ভবিষ্যতে সুখ-শান্তিতে বাস করার পথ উন্মোচন করবে!!এই সব অন্তসারশূন্য, গিফটকেন্দ্রিক দেখানোপনার ভালোবাসার তোড়ে ভেসে গেছে ১৪ ফেব্রুয়ারিতেই একাত্তর পরবর্তী সবচেয়ে বড় ছাত্র আন্দোলন ও স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে ছাত্রদের মহত্তোর সংগ্রাম ও অর্জনের ইতিহাস।

কি সেই ১৪ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস?

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রু18য়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ছাত্র জমায়েতের ডাক দেয়। মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দী মুক্তি ও জনগণের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে এই জমায়েত। সেটাই পরিণত হল বুট ও বুলেটের দমনে পিষ্ট জনতার এক বিরাট প্রতিরোধে। কে জানত বসন্তের আগুনরাঙা রঙের সঙ্গে মিশে যাবে ছাত্রদের রক্ত! জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দিপালীসহ সারাদেশে প্রাণ দিল ১০ জন। সরকারি হিসাবে গ্রেফতার ১,৩১০ জন। কিন্তু অকুতোভয় ছাত্রজনতার প্রতিরোধে মজিদ খানের শিক্ষানীতি স্থগিত করতে বাধ্য হয় তৎকালীন স্বৈরতান্ত্রিক সরকার। ধরা হয় ৯০ স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের পতনের প্রথম পেরেক গাঁথা হয়েছিলো এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। সেই থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি হয়ে ওঠে মুক্তিকামী মানুষের প্রতিরোধ চেতনার দিন। সেই থেকে দিনটি পালিত হচ্ছে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে।

যেভাবে হারিয়ে গেলো দিবসটি    

শোষণ টিকিয়ে রাখতে শাসকশ্রেণি জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য আইন, প্রথা, ভাষা, সংস্কৃতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে শোষণের অনুকূলে প্রবাহিত করতে তৎপর হয়। তেমনি ১৯৯০-উত্তর ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী তার সংসদীয় স্বৈরাচার অটুট রাখতে, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে জনগণের অর্জনগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ১৮ বছরের নিরন্তর প্রচারণার মধ্য দিয়ে তারা সফল হয়েছে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। গুটি কয়েক প্রগতিশীল সংগঠনের ছোট্ট প্রচারণা ছাড়া ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের নামটি পর্যন্ত আজ বিলীন প্রায়। মিডিয়ায় প্রচারে খুব সামান্যই আসে দিবসটির কথা।

সেই এরশাদ এখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত!

পুরনো চকলেটকে যেমন একটু মাল-মশলা মিশিয়ে নতুন মোড়কে আর্কষণীয়ভাবে আবার সবার সামনে উপস্থাপন করা হয়,তেমনি স্বৈরতন্ত্রও আজ নতুনভাবে সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র হিসেবে শোষণ অব্যাহত রেখেছে। সেই স্বৈরতান্ত্রিক এরশাদ সরকারের দল আজ বিরোধী দল এবং এরশাদ স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। সেই স্বৈরাচারী এরশাদ আজও তার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত নয়,দলীয়ভাবে তার দল আজ পর্যন্ত করেনি কোন আত্মসমালোচনা। তবু আজ তারাই নিয়েছে গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব!

পুতুলের কোনও ন্যায়-অন্যায় বোধ বা অপমানের অনুভূতি থাকে না, পুতুলের মালিকরা ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে। তেমনি এসব শিক্ষার্থীদেরও পুতুলের মতো ব্যবহার হয় কখনও মিছিলে,কখনও বড় ভাইদের দখলদারিত্ব পাহারায়,কখনও হয় দখলদারিত্বের বলি।

চলছে শিক্ষাঙ্গনে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের স্বৈরতন্ত্র

খুব বেশি অতীতের দিকে যেতে হবে না। সাম্প্রতিক কিছু উদাহরণই তুলে ধরবে লেবাসি গণতন্ত্রের আসল রূপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাকের্টিং বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র হাফিজুর রহমান মোল্লা ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের অত্যাচারে ,শীতে গেস্টরুম ডিউটি দিতে দিতে নিউমোনিয়ায় মারা গেল ২ ফেব্রুয়ারি। এ শুধু এক হাফিজুরের কথা নয়। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন চোখে নিয়ে যখনই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে, তাদেরকে হলের একটি সিট নিশ্চিত করার জন্য সহ্য করতে হয় ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের অমানুষিক নির্যাতন। নিজের দলের ক্ষুদ্র স্বার্থে (যেখানে সমগ্র ছাত্রসমাজের স্বার্থে11র ছিটেফোটাও থাকে না) তারা সদ্য আগত ছেলেমেয়েদেরকে হাতের পুতুলে পরিণত করে। পুতুলের কোনও ন্যায়-অন্যায় বোধ বা অপমানের অনুভূতি থাকে না, পুতুলের মালিকরা ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে। তেমনি এসব শিক্ষার্থীদেরও পুতুলের মতো ব্যবহার হয় কখনও মিছিলে,কখনও বড় ভাইদের দখলদারিত্ব পাহারায়,কখনও হয় দখলদারিত্বের বলি।

এই শিক্ষার্থীদের চোখের স্বপ্নের ফিকে হওয়ার যন্ত্রণা আমরা আজ উপলব্ধি করি না। উপলব্ধি করি না এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রয়োজনীয়তা। তাদের হাত ধরে এক সঙ্গে এই অন্যায়কারীদের হাত ভেঙে ফেলার ভালোবাসাও আজ আমাদের মনে জাগ্রত হয় না, যে ভালোবাসায় ১৯৮৩ সালে হাতে হাত রেখে রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল আমাদের উত্তরসূরিরা।

অপরদিকে আমরা দেখি ভ্যাট বিরোধী আন্দোলন। শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে সুলভে দেওয়ার বিপরীতে গণতান্ত্রিক সরকার যখন তা আরও বেশি বাণিজ্যিকরণ করার বাসনায় কর সংযোজনের উদ্যোগ নেয়,তখন দেয়ালে পিঠ ঠেকতে ঠেকতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেখালো কিভাবে সমবেত হয়ে দাবি আদায় করতে হয়। শুধু ছাত্রছাত্রীরা নয়,দেশের আপামর জনগণও ছাত্রদের এই আন্দোলনকে যেভাবে নিজেদের আন্দোলনের মতো সঙ্গে থেকেছে,সমর্থন দিয়েছে,তা ১৯৮৩-র ছাত্র আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকেই বার বার মনে করিয়ে দেয়।

পুলিশ অবৈধভাবে চাঁদা দাবি করে জনগনের কাছ থেকে, চাঁদা দিতে না পারায় মীরপুরে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে মারে চা দোকানদার বাবুলকে। ৯৫% ঝলসানো মৃত বাবুলের সাদা ব্যান্ডেজে আবৃত শরীরের মতোই সাদা হয়ে থাকে আমাদের চোখ, ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠে না সেখানে।

সংসদীয় স্বৈরাচারে পিষ্ট জনগণ

আজ এই গণতান্ত্রিক দেশেই যখন মিরপুরের বস্তি অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ করা হয় কোনও রকম পুনর্বসানের ব্যবস্থা ছাড়া, যখন হাজার হাজার বস্তিবাসী তীব্র শীতের মধ্যে স্বর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নীচে রাত্রিযাপন করে; যখন রিকসা শ্রমিককে বিনা কারণে মারধর করে পায়ে গুলি করে নিজেদের আধিপত্য ঘোষণা করে গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ, সেটাকে কিভাবে গণতান্ত্রিক চরিত্র হিসেবে মূল্যায়ন করা যায়? এটাই কি স্বাধীনতা বা গণতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ? এসব ঘটনাতেও প্রতিবাদের ঝড় উঠে না ছাত্র সমাজের বুকে। তারা কি এসব ভূমিহীন, নিঃস্ব মানুষগুলোর জন্য ভালোবাসা অনুভব করে?

স্মার্ট গার্মেন্টস, তাজরীনে হাজার হাজার শ্রমিক পুড়ে মরে। সাভারে রানা প্লাজার ভবন ধসে মারা যায় হাজার হাজার শ্রমিক। তাদের মৃত্যু আমাদের নাড়া দেয় না। তাদের প্রতি ভালোবাসা আমরা অনুভব করি না

আজ পুলিশ অবৈধভাবে চাঁদা দাবি করে জনগনের কাছ থেকে, চাঁদা দিতে না পারায় মীরপুরে প্রকাশ্যে পুড়িয়ে মারে চা দোকানদার বাবুলকে। ৯৫% ঝলসানো মৃত বাবুলের সাদা ব্যান্ডেজে আবৃত শরীরের মতোই সাদা হয়ে থাকে আমাদের চোখ, ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠে না সেখানে। সব জায়গায় আজ চোখে পড়ে স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন, সংঘবদ্ধ শক্তির অভাবে তা হয়ে উঠে না স্ফুলিঙ্গ। স্মার্ট গার্মেন্টস, তাজরীনে হাজার হাজার শ্রমিক পুড়ে মরে। সাভারে রানা প্লাজার ভবন ধসে মারা যায় হাজার হাজার শ্রমিক। তাদের মৃত্যু আমাদের নাড়া দেয় না। তাদের প্রতি ভালোবাসা আমরা অনুভব করি না; যদিও তাদের রক্তঘামের বদলেই দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সঞ্চিত রিজার্ভে আজ ৩য় আমরা। গৌরবে ১০০ হাত ফুলে যায় আমাদের বুকের ছাতি এবং এর সুবিধা আমরা হাসিমুখে ভালোবেসে দুহাত পেতে গ্রহণ করি।

12

স্বাধীনতা, ভালোবাসা, গণতন্ত্র সবই আজ আমরা খুঁজি শুধু নিজেদের ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে। যদিও সমষ্টির অংশগ্রহণ ছাড়া সেটা হয়ে ওঠে ছেড়া কাঁথায় বসে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার মতো। আমরা ইতিহাস জানতে চাই না,বরং ইতিহাস মুছে ফেলার আয়োজনে অংশ নেই সোল্লাসে। এজন্যই আজ স্বৈরাচারী এরশাদই হয়ে উঠতে পেরেছে গণতন্ত্রের পরাকাষ্ঠা! আমরা সেদিক থেকেও মুখ ফিরিয়ে রাখি, যেমন রাখি রাজনীতি থেকে! আসলে আমরা মুখ ফিরিয়ে রাখি নিজেদের থেকে। আমরা ঘটনা দেখি, রুষ্ট হই। নিজেদের খারাপ থাকা নিয়ে রাগ হয়,তবুও আরও ভালো থাকার স্বপ্নও দেখি। কিন্তু ভালো না থাকার কারণ অনুসন্ধান করি না এবং সমস্যা সমাধানের পথও খোঁজ করি না।

মানুষকে ভালোবাসা করুণা নয়; সামাজিক দায়বদ্ধতা

যে স্বাধীনতা,যে গণতন্ত্রের জন্য ১৯৫২,১৯৬৯, ১৯৭১ ও ১৯৯০-এ বুকের রক্ত ঢেলেছে জনগণ,সেই রক্তের মর্যাদা রক্ষার দায়বদ্ধতা আমাদের মাঝে আছে কি? আমরা ভিক্ষুককে ২ টাকা দিয়ে আত্মতৃপ্তি পাই। শীতে জর্জরিত মানুষের হাতে কম্বল তুলে দিয়ে মহৎ কাজ করার আহ্লাদে আটখানা হই। কিন্তু তাদের কষ্টের কারণ অনুসন্ধান করি না, তাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেই না। অপরদিকে বাবা-মাকে শুধু টাকা দিয়ে দায় শোধ করার বিষয়টি চিন্তাও করতে পারি না, কারণ তাদের প্রতি থাকে ভালোবাসার দায়বদ্ধতা। সেই ভালোবাসা আমরা দেশের জনগণের প্রতি অনুভব করি না। ভালোবাসার কারণেই কাঞ্চন, জাফর, দিপালী পেরেছে ছুটে গুলির সামনে নির্ভীক হতে।  রাজপুত্রের একার সুপারম্যান সদৃশ ক্ষমতা নয়, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় সামষ্টিক শক্তিকে সম্বল করে স্বশস্ত্র রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে খালিহাতে লড়েছিল তারা। তাদের হাতিয়ার ছিল সমষ্টির ভালোবাসা,জনগণের স্বার্থের প্রতি ভালোবাসা। আমরা কি আজ পারি সেভাবে সমষ্টিকে ভালবাসতে, নিজেকে ভালবাসতে? পুঁজিবাদ আমাদের একা একা ভালো থাকার মন্ত্র শেখাতে থাকে। এখানেই থাকে বিশাল ফাঁকি। ব্যক্তির স্বার্থ সমষ্টির স্বার্থের সঙ্গে বিলীন। একা একা এই সমাজে ভালো থাকা যায় না, কোনও অধিকারই একা আদায় করা যায় না। এই স্বাভাবিক বোধটুকু কেড়ে নেওয়া হয়েছে সমাজের ছাত্রদের মন থেকে, আপামর জনসাধারণের মন থেকে।

181584_1557224412459_1032476_n

যখন সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র প্রতিনিয়ত রুদ্ধ করছে প্রতিবাদের ভাষা, হরণ করছে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার, কেড়ে নিচ্ছে মৌলিক অধিকার পাওয়া সুযোগটুকু; তখন স্বৈরাচার প্রতিরোধে দিপালী,কাঞ্চনদের রক্তের ঋণ শোধা করার দায়িত্ব হয়ে উঠেছে আমাদেরই দায়িত্ব। স্বৈরতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে আমাদেরকেই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে হবে। জনগণের মুক্তির প্রতি ভালোবাসা বুকে নিয়ে সংগ্রাম করতে হবে।

বসন্ত যৌবনের প্রতীক। যৌবনই হলো প্রেম ও বিদ্রোহের শ্রেষ্ঠ সময়। প্রেম থেকে সংগ্রামটুকু বাদ দিলে যৌবন আর যৌবন থাকে না, তাকে বলে বার্ধক্য। এর থেকে কারোরই মুক্তি নেই, প্রেমের ধারণা তো অলীক।

যৌবন ও গৌরবের ফেব্রুয়ারি

আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ফেব্রুয়ারি মাস খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ১৪ এবং ২১ ফেব্রুয়ারি বেদনা এবং গৌরবের এক আশ্চর্য মিশ্র চেতনার জন্ম দেয়। প্রকৃতিতেও বসন্তের সূচনা হয় এ মাসেই। বসন্ত যৌবনের প্রতীক। যৌবনই হলো প্রেম ও বিদ্রোহের শ্রেষ্ঠ সময়। প্রেম থেকে সংগ্রামটুকু বাদ দিলে যৌবন আর যৌবন থাকে না, তাকে বলে বার্ধক্য। এর থেকে কারোরই মুক্তি নেই, প্রেমের ধারণা তো অলীক। যখন চারদিকে শোষণ-নিপীড়ন-পরাধীনতার নতুন নতুন কৌশল রচিত হচ্ছে, তখন সংগ্রামের চেতনাকে ভুলিয়ে দিতে তৎপর আত্মকেন্দ্রিক প্রেমের সংস্কৃতি কখনও আমাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।

শেষ করছি স্বৈচারবিরোধী আন্দোলনে সৈনিক গণসংগীত শিল্পী কামরুদ্দিন আবসারের গাওয়া গান দিয়ে-

‘আমি কোনও ভালোবাসার গল্প বলিনি

যেটুকু বলেছি সবটুকু যুদ্ধের

দিনরাত্রি জীবন ভর

মানুষের সাথে মানুষের

মানুষের সাথে মানুষের…’

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

Latest from রাজনীতি

গো টু টপ