১৪ ফেব্রুয়ারি: ভ্যালেন্টাইন নাকি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস!

১৪ ফেব্রুয়ারি। সারা বিশ্বে দিনটির জন্য অপেক্ষা করে মূলত তরুণ-তরুণীরা। পালিত হয় ‘বিশ্ব ভালোবাসা দিবস’। পশ্চিমা দেশগুলোর অনুসরণে, কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশেও এই দিনটির জন্য উত্তেজনা প্রবল। ফুলের দোকানগুলোতে উপচেপড়া ভিড়। প্রিয়জনদের জন্য উপহার সামগ্রী বিক্রির রমরমা ব্যবসা। মুদ্রণ ও প্রচার মাধ্যমগুলোতেও বিশেষ আয়োজন থাকে ভালোবাসা বিদস উপলক্ষে। রঙিন পাতায় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রথম ভালোবাসার অভিজ্ঞতা, কেমন হবে দিনটির সকাল-সন্ধ্যা-অপরাহ্নের সাজ, রোমান্টিক কাহিনী নির্ভর নাটক কিংবা টেলিফিল্ম। পাল্লা দিয়ে মোবাইল অপারেটরগুলোর দারুন সব অফার, কনসার্টের নামে রাতভর হৈ-হল্লা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়োগ করা হয় পুলিশ ফোর্স। (কারণ আমাদের তরুণ-তরুণীরা তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় নিয়ন্ত্রণহীন। পশ্চিমা সংস্কৃতি হলেও, দিনটি উদযাপনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা তাদের চাইতে অনেক এগিয়ে)। ভালোবাসার বন্যায় প্লাবিত চারপাশ। সেই তোড়ে ভেসে গেছে আমাদের নিকট অতীতের মহত্তোর সংগ্রাম ও অর্জনের ইতিহাস। দিনটির গৌরবোজ্জ্বল ও রক্তাক্ত ইতিহাস এবং বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে লিখেছেন আহম্মেদ দ্বীপু ও শারমিন রহমান

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ লেফটেন্যান্ট জেনালের হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করেন। মৌলিক অধিকারের ভূ-লুণ্ঠন এবং বিরোধী দলীয় কর্মী ধর-পাকড়, নির্যাতনের মধ্যদিয়ে এরশাদ আমলের শুরু। প্রথম থেকেই ইসলাম ধর্মকে অত্যাচারের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এরশাদ সরকার। সামরিক শাসনের প্রথম দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ করে। ২৪ শে মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টার লাগাতে গিয়ে বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর তিন সদস্য গ্রেফতার হন। পরে সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালতে তাদের সাত বছরের কারাদণ্ড হয়। সেই থেকে শুরু হয় সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আপোষহীন লড়াই।

180679_1557220372358_5429130_n

বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দ স্বাধীনতা দিবসে সাভারের স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ শেষে শহিদ বেদিতে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। মিছিলের খবর শুনে সাভার সেনানিবাস থেকে সেনাবাহিনী এসে স্মৃতিসৌধে ছাত্রদের ওপর নির্মম নির্যাতন করে।

সরকারের ফ্যাসিবাদী শাসনের কারণে সে সময় সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়লেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে লাল-কালো লিখন অব্যাহত রাখে ছাত্রসমাজ। চলতে থাকে দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামের প্রাথমিক প্রস্তুতি।

এ সময় ছাত্রনেতারা দেশজুড়ে গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বিবৃতি প্রদান করা হয়, যা প্রথম লিখিত প্রতিবাদ।

১৯৭১ এর আগে পূর্ববাংলার ছাত্রদের প্রধান দাবি ছিল, একটি অবৈতনিক বৈষম্যহীন শিক্ষানীতি। এ সময় পূর্ব পাকিস্তান সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দেশের আপামর জনগণের উদ্দেশ্যে ১১ দফা দাবি প্রণয়ন করে। এরশাদ ক্ষমতায় আসার পরপরই শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। এতে শিশু বয়স থেকেই ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব করে-শিক্ষার ব্যয়ভার বাড়িয়ে ৫০% বহনকারীদের ( রেজাল্ট খারাপ হলেও) উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয় এই শিক্ষানীতিতে। এর ফলে শুধু উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের পড়াশুনার সুযোগ অব্যাহত থাকে এবং এতে চাকরিজীবী, কৃষক, শ্রমিকের সন্তানদের শিক্ষার প্রয়োজনহীনতাকে নির্দেশ করা হয়। সাম্প্রদায়িকতা, শিক্ষা বাণিজ্যিকীকরণ আর শিক্ষা সংকোচনকে ভিত্তি করে প্রণীত এই ‘মজিদ খান শিক্ষানীতি’-র বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন শুরু করে। ১৭ সেপ্টেম্বর (১৯৮২) শিক্ষা দিবসে, এই শিক্ষানীতি বাতিলের পক্ষে ছাত্র সংগঠনগুলো একমত পোষণ করে।

181584_1557224412459_1032476_n

১৯৮২ সালের ২১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং তাদের নেতৃত্বে শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে গণসাক্ষরতা অভিযান চলে। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘মজিদ খান শিক্ষানীতি’র বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার কাজ চলতে থাকে। ছাত্রদের এই সংগ্রামকে প্রতিরোধ করতে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি খন্দকার মোহাম্মদ ফারুককে গ্রেফতার করা হলে ছাত্ররা আবারও ফুঁসে ওঠে। খন্দকার মোহাম্মদ ফারুকের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি ’৮৩ সালে দেশে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। সফল ধর্মঘট পালনের পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি হাতে নেয়।

একই ধারার অবৈতনিক বৈষম্যহীন ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতির দাবিতে, ’৮৩-র ১৪ ফেব্রুয়ারি মিছিলে শামিল হয় কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। মিছিলের নেতৃত্বে অগ্রভাগে ছিল ছাত্রীবৃন্দ। হাইকোর্টের গেট এবং কার্জন হল সংলগ্ন এলাকায় কাঁটাতারের সামনে ছাত্রীরা অবস্থান নেয় এবং নেত্রীবৃন্দ কাঁটাতারের উপর দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ জানাতে থাকে। অতর্কিতে পুলিশি হামলার শিকার হয় ছাত্র-জনতা। পুলিশ শিক্ষার্থীদের ওপর রঙিন গরম পানি ছিটায় এবং গুলিবর্ষণ করে। সেদিন জয়নাল নামে একজন ছাত্রকে গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি পুলিশ, তার শরীরে বেয়নেটের আঘাত করে করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। শুধু জয়নাল নয়-ছাত্রদের ওপর পুলিশি তাণ্ডবের সময় শিশু একাডেমিতে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা দিপালী নামের একটি শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়। দিপালীর লাশের সন্ধান পাওয়া যায়নি পুলিশি তৎপরতায়। কার্জন হল থেকে জয়নালকে ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।

বিকেলে ক্যাম্পাসে একটি যুদ্ধ-পরিস্থিতি তৈরি করে সেনাবাহিনী। তার সঙ্গে যোগ দেয় বিডিআর-পুলিশ। শাহবাগ, টিএসসি চত্বর, কলাভবনের সামনে, নীলক্ষেত, কাঁটাবনের রাস্তা ধরে পুরো অঞ্চল ঘেরাও করে তারা। অপরাজেয় বাংলার সমাবেশে পুলিশ অতর্কিত লাঠিচার্জ শুরু করে। এ সময় বহু ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করা হয়। উপাচার্যের কার্যালয়ে পুলিশ ছাত্রছাত্রীদের হাত-পা ভেঙে ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনার প্রতিবাদে তৎকালীন উপাচার্য পদত্যাগ করেন। কলাভবনে নির্যাতন করা হয় ছাত্রছাত্রী এমনকি শিক্ষকদেরকেও। ঘটনাস্থল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খ ম জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওই বিভীষিকাময় দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্রনেতা মোস্তাক হোসেন বলেন, ‘আমরা জয়নালের লাশ লুকিয়ে ফেলেছিলাম মুহসীন হলের ডাইনিংয়ে। লাশের খোজে পুলিশ চারুকলায় ঢুকে ছাত্রদের নির্যাতন ও গ্রেফতার করে। পোশাকে রঙিন গরম পানির চিহ্ন দেখে গ্রেফতার কাজ চলতে থাকে। অবশেষে মুহসীন হলের ডাইনিংয়ে লাশ পাওয়ার পর অন্যান্য হলে লাশের তল্লাশি বন্ধ করা হয় কিন্তু গ্রেফতার করা হয় দুই সহস্রাধিক ছাত্র-জনতাকে। সরকারি হিসাব মতে এক হাজার ৩৩১ জন। গ্রেফতারকৃতদের প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় শাহবাগের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে। এরপর তাদের তুলে দেওয়া হয় আর্মির হাতে। প্রথমে পুলিশ এবং পরে আর্মি দ্বারা বন্দী ছাত্র-জনতার উপর চলে অমানবিক নির্যাতন। সেই সঙ্গে ছাত্রীদেরকেও গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রবল চাপের মুখে ১৫-১৬ তারিখের মধ্যে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ১৫ তারিখ আন্দোলন আরো ছড়িয়ে পড়লে নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। চট্টগ্রামে প্রতিবাদী কাঞ্চন নিহত হয় একইদিনে। নির্বিচারে গ্রেফতার করা হয় ছাত্রদের। জেলখানায় আর সেনা ব্যারাকে গ্রেফতারকৃত ছাত্রছাত্রীদের ওপর চলে শারীরিক বর্বরতা। পিটিয়ে মেরে ফেলা হয় অনেককে-যার সঠিক সংখ্যা অজ্ঞাতই রয়ে গেছে। স্বাধীন দেশে আর এক ৭১-এর হানাদার বাহিনীর অত্যাচারের ইতিহাস তৈরি হয়।

168373_1557218172303_6960649_n

১৯৭১ এর পর বড় আন্দোলনের দিন- ১৫ ফেব্রুয়ারি ’৮৩। সারাদেশের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী স্বাধীনতা আর গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্যে মুখোমুখি হয় স্বৈরাচারীর আজ্ঞাবহ পুলিশ বাহিনীর। আর সেই আত্মবলিদানের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদের তিনটি মৌলিক দাবি পূরণ হয়। শিক্ষানীতি স্থগিত হয়ে যায়, বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়, সামরিকতন্ত্রের অবসান না হলেও- ঘরোয়া রাজনীতির অধিকার দিতে বাধ্য হয় সামরিক জান্তা।

মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাস্তবায়িত হলে, শিক্ষার ব্যয়ভারের পঞ্চাশ ভাগ শিক্ষার্থীর পরিবারকে বহন করতে হতো-এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হতো অনেককে। শিক্ষা অর্জনের জন্য মাতৃভাষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু এ নীতি অনুযায়ী শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই বাংলার সঙ্গে আরবি ও ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়, যা ছিল আমাদের ভাষা আন্দোলনের চেতনার পরিপন্থি। পশ্চাৎপদ এবং ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির আগ্রাসনের বন্দোবস্ত। শিশুদের জন্য যা হতো নিপীড়নমূলক।

জীবন দিয়ে সেদিন ছাত্র-জনতা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষার্থে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং স্বৈরাচারী সরকার ও প্রশাসনকে বাধ্য করেছিল এ বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতি স্থগিত করতে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য- এ আন্দোলনকেই বলা যায় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রথম বিস্ফোরণ। এরপর গোটা আশির দশকজুড়ে প্রতি বছর এ দিনটি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয় এবং এরশাদবিরোধী আন্দোলনের প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। তখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, বাম প্রগতিশীল ছাত্র ও রাজনৈতিক দলগুলো যার যার অবস্থান থেকে কর্মসূচি দিয়ে দিবসটি পালন করতো এবং সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রচারও ছিল দিনটির পক্ষে।

স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয়। সেই গণতন্ত্রে জনগনের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেনি। কারণ ১৯৯১ সালে সামরিক স্বৈরাচারের স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয় সংসদীয় স্বৈরাচার। জনগণের আন্দোলন, সংগ্রাম ও আত্মদানের ফসল শাসক শ্রেণির কাজে লাগানো এবং শাসনক্ষমতা শ্রেণির বিকাশের স্বার্থে ব্যবহারের নজির বাংলাদেশ এবং বিশ্বের ইতিহাসে অনেক পাওয়া যাবে। স্বার্থসিদ্ধি হয়ে গেলে ক্ষমতাসীন শ্রেণি জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং জনগণের ওপর চালু করে নতুন শেষণমূলক ব্যবস্থা।

শোষণ টিকিয়ে রাখতে জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য আইন, প্রথা, ভাষা, সংস্কৃতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে শোষণের অনুকূলে প্রবাহিত করতে তৎপর হয়। তেমনি ১৯৯০-উত্তর ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী তার সংসদীয় স্বৈরাচার অটুট রাখতে, স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে জনগণের অর্জনগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা করে। আর তাই বিশ্ব ভালোবাসা দিবস বা ভ্যালেন্টাইন যে হিসেবে ১৪ ফেব্রুয়ারি আরোপিত করা হয়েছে প্রচুর কৌশলে। দীর্ঘ ১৮ বছরের নিরন্তর প্রচার এবং চর্চায় স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস বিলীন প্রায়। প্রচারে খুব সামন্যই আসে দিবসটির কথা।

যুদ্ধবাজ রোমান সম্রাট দ্বিতীয় কডিয়াস ২৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমান-যুবকদের যুদ্ধে মনোযোগী করতে বিয়ে ও বাগদানকে বেআইনি এবং বাতিল ঘোষণা করেন। তার এ নিপীড়নমূলক আইনের বিরুদ্ধে সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন-এর সংগ্রাম ছিল স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম। অথচ আজ সেই মহান ভ্যালেন্টাইনের প্রেমের সংগ্রামী চেতনা থেকে সংগ্রামটুকু বাদ দিয়ে কেবল ব্যবসায়িক চটক নিয়ে শাসকশ্রেণি নিজের কাজে লাগাচ্ছে।

আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ফেব্রুয়ারি মাস আমাদের জাতির জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ১৪ এবং ২১ ফেব্রুয়ারি বেদনা এবং গৌরবের এক আশ্চর্য মিশ্র চেতনার জন্ম দেয়। প্রকৃতিতেও বসন্তের সূচনা হয় এ মাসেই। বসন্ত যৌবনের প্রতীক। যৌবনই হলো প্রেম ও বিদ্রোহের শ্রেষ্ঠ সময়। প্রেম থেকে সংগ্রামটুকু বাদ দিলে যৌবন আর যৌবন থাকে না, তাকে বলে বার্ধক্য। এর থেকে কারওরই মুক্তি নেই, প্রেমের ধারণা তো অলীক। যখন চারদিকে শোষণ-নিপীড়ন-পরাধীনতার নতুন কৌশল রচিত হচ্ছে, তখন সংগ্রামের চেতনাকে ভুলিয়ে দিতে তৎপর আত্মকেন্দ্রিক প্রেমের এ সংস্কৃতি কখনও আমাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।

আজ ২১ ফেব্রুয়ারির চেতনাকে ৩০ মিনিটে (পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে) সীমাবদ্ধ করে ফেলার চেষ্টা চলমান। ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৬ ডিসেম্বরকে নিয়ে চলে ফ্যাশন উৎসব। এসবের বিপক্ষে জনগণও নিরন্তর সংগ্রাম করে চলেছে। শিল্পাঞ্চলে মজুরি বৃদ্ধি ও শ্রমিক হত্যা-নির্যাতন বিরোধী ধারাবাহিক শ্রমিক বিক্ষোভ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্ধিত ফি ও অগণতান্ত্রিক প্রশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন, জাতিসত্ত্বার আন্দোলন, আড়িয়াল বিলে ভূমি থেকে উচ্ছেদের বিরুদ্ধেও চলছে গণপ্রতিরোধ। শাসকশ্রেণির ‘স্বাধীনতা’, ‘গণতন্ত্র’র বিপরীতে জনগণের প্রকৃত ক্ষমতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের শর্ত তৈরি হচ্ছে।

আজ কোন চেতনাকে উর্ধ্বে তুলে ধরা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ- গণতন্ত্রের জন্য জনগণের সংগ্রামের চেতনা, দেশ ও স্বাধীনতাকে ভালোবাসার চেতনা, না কি সেই চেতনাকে আড়াল করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রতিষ্ঠিত আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থবাদী ভালোবাসার চেতনা – সিদ্ধান্ত আমাদের।

[লেখাটি সাপ্তাহিক ‘বিচিন্তা’য় প্রকাশিত হয়েছিল।]

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

Latest from নির্বাচিত লেখা

labour_2391847f

মে দিবসের ইতিকথা

‘তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান, তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে
গো টু টপ