হয়তো এভাবেও শুরু হয় : বিনম্র শ্রদ্ধা দীপালি কাঞ্চন জাফর জয়নাল

মনোজ দে।।

সালটা ঠিক মনে নেই।  তবে ২০০৪ বা ৫। ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ বিকেলবেলা। ডাকসুর নিচতলায় ক্যাফেটেরিয়ার পাশে প্রপদের ছোট্ট অফিসটাতে বসে সাজ্জাদ ভাই, সেঁজুতি-রাসেলসহ আমরা কয়েকজন গান-টান গাচ্ছি। রিক্সা থেকে নামলেন এহতেশাম ভাই। আকাশি রংয়ের লম্বা শার্টটার হাতা গুটানো।  হাতে ব্যাগ।  তিনধাপের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে ব্যাগ থেকে বের করছেন চারভাঁজের পৃষ্ঠায় গুটি গুটি অক্ষরে লেখা কাগজ। অফিসের গেটে দাঁড়ালেন। চিন্তাক্লিষ্ট মুখে আত্মবিশ্বাসের দারুণ দীপ্তি। বললেন তোমাদের সঙ্গে জরুরি আলাপ। চেয়ার টেনে বসলেন। আমরাও হরমোনিয়াম তবলা গুটিয়ে সিরিয়াস কোনো মিটিংয়ের মুখোমুখি হবার জন্য প্রস্তুতি নিলাম।

 

180085_1565967351027_1206778_n

 

গলাখাকারি দিয়ে শুরু করলেন ৮৩-এর ১৪ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস। শোনালেন সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণের গণতন্ত্রের অধিকার আদায়ের এক শিউরানো গৌরবগাঁথা।

এভাবেই শুরু হলো।  হয়তো এভাবেই শুরু করা যায়। কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন বলা চলে- ১৪ ফেব্রুয়ারির সেই চাপা পড়া ইতিহাস দীর্ঘ গোঙানির মতো আমাদের অনেকের চেতনায় আর্তনাদ হয়ে উঠেছে।

১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ডাকে ছাত্র জমায়েত। মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দী মুক্তি ও জনগণের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে ছাত্র সমাজের সেই বুকচিতিয়ে দাঁড়ানো রক্তস্নাত প্রতিরোধ। জাফর, জয়নাল, কাঞ্চন, দিপালীসহ সারাবাংলার শ্যামল বুক আবারও সিক্ত হল ১০ শহীদের রক্তে। সরকারি হিসাবে গ্রেফতার হল এক হাজার ৩১০ জন।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার এরশাদের পতন পর্যন্ত প্রতিবছর ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়েছে। নব্বই পরবর্তী পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের আড়ালে চাপা পড়েছে জনইতিহাসের সেই গৌরবময় চেতনা। সেই দিবসটিতে কর্পোরেট মিডিয়ার বেদৌলতে সাড়ম্বরে পালিত হতে শুরু করছে ভ্যালেন্টাইন ডে।

আমরা শুনলাম। জানলাম। এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম ১৪ ফেব্রুয়ারি নতুন করে স্বৈরাচার দিবস হিসেবে পালনের। এহতেশাম ভাই স্লোগান তৈরি করলেন- ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেস্টাইন ডে নয়, স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করুন।

হাতে সময় মাত্র একদিন। তাৎক্ষণিকভাবে প্রোগ্রাম করার টাকা জোগাড় করাটাও সহজ নয়। তাই ফটোকপি করে হাজার দুয়েক হ্যান্ডবিল করা হলো। আর সিদ্ধান্ত হলো সে সময়কার ছাত্র আন্দোলনের ঘটনা ও ছবি নিয়ে একটা প্রদর্শনী করা হবে। কিন্তু জটিলতা হচ্ছে এতো অল্প সময়ে সে সময়কার ছবি পায় কোথায়? কম্পিউটার, ইন্টারনেট মোটেই সহজলভ্য নয়। শেষে পাওয়া গেল নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের উপর লেখা একটা বই। বইয়ের ভেতরের ছবিগুলো কাঁটাবনের প্রিন্ট পয়েন্ট থেকে এনলার্জ করে ফটোকপি করা হল। এরপর সেগুলো ব্রাউন পেপারের মধ্যে সেঁটে তৈরি করা হলো ফ্রেম। আর ডাকসুর সামনে গুরাদুয়ারার পেছনের দেওয়ালে টানা কালো কাপড় টানিয়ে জেমস ক্লিপ আর পিন দিয়ে সারি সারি সাজানো হলো ছবির ম্যাটারগুলো।

যদিও আমরা অনেকে কিছুটা কনফিউজড ছিলাম। ভ্যালেন্টাইনের এই প্রবল তোড়ে আমরা হাস্যকর হয়ে উঠব না তো? তবে একগুঁয়েমি ছিল প্রবল।

হ্যান্ডবিল আগের দিনই তৈরি হয়ে গেছিল। বসন্ত বরণ উৎসবে কয়েক দলে ভাগ হয়ে আমরা সেগুলো বিতরণ করলাম।

যদিও আমরা অনেকে কিছুটা কনফিউজড ছিলাম। ভ্যালেন্টাইনের এই প্রবল তোড়ে আমরা হাস্যকর হয়ে উঠব না তো? তবে একগুঁয়েমি ছিল প্রবল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও প্রগলিশীল ছাত্র-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর থেকেও সাড়া পেলাম ভালই বলা চলে।

পরের বছরটাতে আয়োজনটা একটু বাড়ল। হ্যান্ডবিল, প্রদর্শনীর সঙ্গে ডাকসুর সবুজ চত্বরে আলোচনা সভা ও গণসংগীত। আলোচক হলেন এরশাদের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের প্রথম ছাত্রবন্দী শিবলি কাইয়ূম, সে সময়ের ছাত্রনেতা ফয়জুল হাকিম লালা ও আকমল হোসেন স্যার। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক সক্রিয় প্রগতিশীল ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে কিছুটা হলেও এবারের আয়োজনে সম্পৃক্ত করা গেল।

184739_1565963790938_6966325_n

এভাবেই শুরু হলো।  হয়তো এভাবেই শুরু করা যায়। কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন বলা চলে- ১৪ ফেব্রুয়ারির সেই চাপা পড়া ইতিহাস দীর্ঘ গোঙানির মতো আমাদের অনেকের চেতনায় আর্তনাদ হয়ে উঠেছে। হয়তো ভবিষ্যতে কোনো একদিন প্রলয়ঙ্কর বিস্ফোরণে দিনে দিনে বেড়ে ওঠা অন্য সব বঞ্চনা, যন্ত্রণার রক্তাক্ত ইতিটানার মহাযুদ্ধে চেতনার একচিলতে বারুদ জোগাবে সে রক্তাক্ত চেতনা। হোক না সামান্য, তাতে কি যায় আসে?

হয়তো এভাবেই একদিন শুরু হবে মানুষের নতুন ইতিহাস।

হয়তো ককটেল-পেট্রোলবোমা আর বন্দুকের গুলির মাঝে স্যান্ডউইচ হতে থাকা জনতা সৌদি আরবে দাস হতে যাওয়ার লাইনে কাড়াকাড়ি ভীড় করবে না সেদিন। জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নিকমহারামি এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে শুরু করবে পাল্টা প্রতিরোধ। আর তার জন্য বড় প্রয়োজন চেতনাকে মৃত হতে না দিয়ে জীবিত রাখা। ইতিহাস দিক বর্তমান জীবনকে সেই দিকবদলের বারুদ।

 

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত।)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

Latest from নির্বাচিত লেখা

labour_2391847f

মে দিবসের ইতিকথা

‘তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান, তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে
গো টু টপ