সমাজের বিপ্লবী পরিবর্তনেই আসবে নারীর প্রকৃত মুক্তি

৮ মার্চ। আন্তর্জাতিক নারী দিবস।  ১৮৫৭ সালে শ্রমের ঘন্টা কমানো, নারীদের ভোটাধিকার, মাতৃত্ব ছুটি, ফ্যাক্টরির পরিবেশ উন্নত করা ইত্যাদি দাবী দাওয়া নিয়ে আমেরিকার নারী শ্রমিকরা প্রথম রাস্তায় নেমেছিলেন। নারী সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯১০ সালে জার্মানীর নারী নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত নারী সম্মেলনে এই দিনটিকে নারী দিবস হিসাবে ঘোষনা করে। ৮ মার্চ তাই শোষিত বঞ্চিত নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক গৌরবোজ্জ্বল দিন।


আজ ২০১৬ সালে এদেশের নারীদের অবস্থা ভয়াবহ। গার্মেন্টস নামক মৃত্যুকূপে লাখ লাখ নারী শ্রমিক ১২/১৪ ঘন্টা শ্রম দিতে বাধ্য হচ্ছেন। যাদের  মজুরী বিশ্বের সবচেয়ে কম।  মাতৃত্ব ছুটি দূরের কথা,  বাধ্যতামূলক ওভারটাইম, জরিমানা, দিনের পর দিন পাওনা পরিশোধ না করা সাধারণ ঘটনা। আবার পাওনার দাবীতে আন্দোলনে চলে পুলিশি নির্যাতন।

800px-Clara_Zetkin_Blatt4
শহর গ্রামের লাখ লাখ নারী শ্রমিকের উপর বর্ধিত শ্রম শোষণ বাদেও বিশেষত কৃষক ও সাধারণ মধ্যবিত্ত নারীরা এখনো গুরুতরভাবে সামন্ততান্ত্রিক ও মধ্যযুগীয় ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার। যৌতুক, ধর্ষণ, ফতোয়াবাজী, বাধ্যতামূলক পর্দা প্রথা, শুধুমাত্র ভোগের সামগ্রী হিসাবে গণ্য করা, সম্পত্তি অধিকারে অসমতা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন প্রভৃতি উপায়ে আজ লক্ষ কোটি নারী বঞ্চিত-অধিকারহীন, মানসিকভাবে পঙ্গু।
বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় দেহ ব্যবসা, সুন্দরী নারী প্রতিযোগীতা, ফ্যাশন শো, মডেলিং, পত্রিকা, বিজ্ঞাপনে, সিনেমায়, সংস্কৃতি, শিল্পে নারীকে করে তুলেছে ভোগ্যপণ্য, বেচা-কেনার বস্তু। তথাকথিত নারীবাদী এবং এন.জি.ও. ওয়ালাদের মতে এটাই হলো নারী স্বাধীনতা। শাসকগোষ্ঠীর দালাল নারীবাদীরা বা এনজিওগুলো নারীর প্রতি শ্রম শোষণ ও নারী নীপিড়নের শক্ত প্রতিবাদ করেনা। তারা নারী মুক্তি, নারী স্বাধীনতা বলতে বোঝায় নারীদের শিক্ষিত হওয়া, অফিস আদালতে চাকুরী করা। নারীবাদী বুদ্ধিজীবি লেখকরা খুব বেশী হলে মধ্যবিত্ত নারীদের উপর সামন্তবাদী শোষণ নিপীড়নের বিরোধীতা করে। তারা গার্মেন্টস শ্রমিক, ইটভাঙ্গা শ্রমিক, আয়া, নার্সসহ কর্মজীবী নারীদের বাঁচার তাগিদে জীবন-মরণের লড়াইয়ের পক্ষে মূলত দাঁড়ায়না। তারা পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের অধীনে নারীদের পণ্য পরিণত হওয়াকে বিরোধীতা করে না।
সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা পরিচালিত এন.জি.ও গুলোর ক্ষুদ্র ঋনের কবলে পড়েছেন গ্রামের ভূমিহীন নারীরা। অভাব অনটন দূর করার প্রলোভন দেখিয়ে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগী কেনা, কুটির শিল্প ও ব্যবসা করার নাম করে ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে এবং কিস্তিতে কিস্তিতে সুদ-আসল মিলিয়ে এই নারীদের শ্রম শোষণ করে কোটি কোটি টাকা মুনাফা লুটছে সাম্রাজ্যবাদ ও তার এদেশীয় দালালরা। দালাল প্রচার মাধ্যমগুলো এটাকে স্বাবলম্বী হওয়ার মডেল হিসাবে উপস্থাপন করে। কিন্তু কত ভূমিহীন যে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করে, ভিটেমাটি ছেড়ে পালিয়ে বেড়ায় তার প্রচার দালালেরা করে না। তারা ভূমিহীনদের প্রকৃত মুক্তির পথ দেখায় না বরং মুক্তির সম্ভাবনাগুলোকে হত্যা করে ভুল পথে পরিচালিত করে।
পৃথিবীর কোথাও এমনকি সবচেয়ে উন্নত দেশে ‌‌”তথাকথিত গণতন্ত্রে” নারীরা সম্পূর্ণ সমানাধিকার পায়নি। তথাকথিত এসব গণতন্ত্র শুধু জাঁকাল গালভরা কথার বড় বড় প্রতিশ্রুতি আর স্বাধীনতা ও সাম্যের নামে আড়ম্বর-ভরা ধ্বনির গণতন্ত্র। কিন্তু কাজের বেলায় নারীদের স্বাধীনতাহীনতা ও নিকৃষ্ট অবস্থা এবং শ্রমিক ও শোষিতের স্বাধীনতাহীনতা ও নিকৃষ্ট অবস্থাকে ঢেকে রাখে।
অত্যাচারী ও অত্যাচারিতের মধ্যে, শোষক ও শোষিতের মধ্যে কখনও সাম্য হতে পারে না, হয়নি, হবে না। যতক্ষণ না আইনত নারীরা পুরুষের সমান সুবিধা পাচ্ছে, যতক্ষণ না মূলধনের কবল থেকে শ্রমিকরা স্বাধীনতা পাচ্ছে, আর মালিক ও মহাজন এবং ধনিদের দাসত্ব থেকে শ্রমজীবী কৃষক স্বাধীনতা পাচ্ছে ততক্ষণ নারীর প্রকৃত “স্বাধীনতা” হতে পারে না, হয়না, কখনও হবে না।
সমাজে যতদিন শোষণ থাকবে ততদিন শাসকগোষ্ঠী এই বৈষম্য টিকিয়ে রাখার স্বার্থে পুরুষতন্ত্র টিকিয়ে রাখবে। পুরুষতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছে এ সমাজ ব্যবস্থা। সম্প্রসারণবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, আমলা-মুৎসুদ্দী পুঁজিবাদ ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ সারা পৃথিবী জুড়ে দারিদ্র্যের কারণ ও নারী নিপীড়নের হোতা। তাই এই ব্যবস্থায় শ্রমজীবী নারী-পুরুষসহ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের কারও মুক্তি নেই। কিন্তু সমাজের নিপীড়িত শ্রেণী ও জনগণের মুক্তি ব্যতিত পৃথকভাবে নারীর মুক্তি হতে পারে না। তাই সমাজের সার্বিক বিপ্লবী পরিবর্তনের উপরেই নারীর মুক্তি নির্ভরশীল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

Latest from আন্তর্জাতিক

গো টু টপ