গ্রামীণ জনগণকে শোষণে আসছে নতুন ফর্মুলা

সুজিত সরকার

আওয়ামী লীগ সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে, অর্থাৎ ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে “মধ্য আয়ের” দেশে পরিণত করার  প্রয়োজনীয় রসদ ফুরিয়ে আসছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ভূ-রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ফাঁদ, বিনিয়োগে অনাস্থা, দুর্নীতিসহ বিভিন্ন কেন্দ্রিক চাপে সরকারের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে। এ সংকট কাটাতে নতুন আরও এক ফাঁদের প্রবর্তন করা হয়েছে। কেতাবি ভাষায় যার নাম দেওয়া হয়েছে, “রাষ্ট্রীয় আর্থিক অন্তর্ভূক্তি” (national financial inclusion)। এটাকেই সরকার আলাদীনের চেরাগ বানিয়ে এ সংকট কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা করছে।

সরকারের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে যা ঘটবে-

– মুনাফাখোর ব্যাংকিং খাতের সম্প্রসারণ ঘটানো হবে
– তৃণমূলে সুদের বোঝা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হবে
– মাত্রাতিরিক্ত শোষণের কবলে পড়বে গ্রামীণ জনগণ

0,,16007089_303,00

বাংলাদেশে নতুন করে প্রবর্তন হলেও এ পরিকল্পনা একেবারে নতুন কিছু নয়। বিশ্বব্যাংকের প্রবর্তন করা এই ফর্মুলা ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করেছে ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, পেরু, প্যারাগুয়েসহ অন্তত ৫০টি দেশ। বাংলাদেশে এই ফর্মুলা আমদানি করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান। ইতোমধ্যে, ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০১৬-এ আয়োজিত একটি বৈঠকে national financial inclusion এর প্রয়োজনীয়তায় সহমত প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

কী এই রাষ্ট্রীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি? সংক্ষেপে বললে, জনগণের আয়কে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আর্থিক প্রবাহের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হবে। সবার আয় যাতে করে ব্যাংক, খুদ্র ঋণ ও ইন্স্যুরেন্সের মতো খাতের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে একীভূত হয় ও নজরদারি করা যায়। ফেব্রুয়ারি মাসে যে বৈঠকটি আয়োজিত হয়, তার মূল প্রতিপাদ্য ছিল গ্রামীণ ও ছিন্নমূল জনগোষ্ঠীর অর্থ এই কেন্দ্রীয় অন্তর্ভুক্তির মধ্যে আনা।
বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনগণের এক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এই গ্রামীণ ও প্রান্তিক গোষ্ঠী। যাদের অধিকাংশের হাতেই থাকে কাঁচা টাকা – যে টাকা ব্যাংকিং বা অনুরুপ সেবা খাতের আওতার বাইরে থাকে। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় অর্থ প্রবাহের বাইরে। এই টাকা আদান -প্রদান হতে থাকে এক হাত থেকে আরেক হাতে, দেশের অভ্যন্তরেই। কিন্তু তা থেকে যায় রাষ্ট্রীয় অর্থ প্রবাহের বাইরে। এই অর্থ পুঞ্জিভূত হলে, রাষ্ট্রীয় পুঁজিতে রুপান্তর করতে পারলেই ‘অপার সম্ভাবনা’। বর্তমানে কৃষকদের জন্য ১০ টাকায় ব্যাংক একাউন্ট খোলার সুবিধা এবং খুদ্র ঋণ কর্মসূচীগুলো সবই রাষ্ট্রীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এজেণ্ডার প্রাথমিক অংশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগের সাবেক সচিব আসলাম আলম বৈঠকে বলেছিলেন, “বিপুল গ্রামীণ জনগণের এই অর্থ অন্তর্ভুক্তির মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব”।
এই জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যাংকিং, ইন্সুরেন্স ও খুদ্র ঋণ খাতগুলোর প্রসার ঘটানো হবে। ব্যবহার করা হবে প্রযুক্তি – মোবাইলে টাকা আদান-প্রদান ও ব্যাংকিং সুবিধা প্রদানকারী সংস্থাগুলোকে। প্রণোদনা দেওয়া হবে ছোট ও মাঝারি শিল্পের বিকাশকে। আর এই কর্মসূচী বাস্তবায়নে সামিল করা হবে সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এই কর্মসূচীতে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে তৈরি করা হবে নতুন ধরণের সেবামূলক পণ্য, যা জনগণের চাহিদা থেকেই যোগান দেওয়া হবে।

তবে, এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল, ব্যাংকিং ও অনুরুপ সেবা খাতের সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও মুনাফার হার কমানোর কোনও চিন্তা-ভাবনা করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকার পর্ষদের চেয়ারম্যান আনিস খান স্পষ্টভাবে বৈঠকে বলেছেন, ব্যাংকের সুদের হার কমানো হবে না। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো বাইরের ব্যাংকগুলোর তুলনায় তেমন কিছুই মুনাফা করে না জানিয়ে তিনি বরং সরকারকে অনুরোধ করেছেন ব্যাংকের ওপর আরও “নমনীয়” আচরণ করার। একই আলোচনায় সরকারি ক্ষুদ্র ঋণের মাত্রাতিরিক্ত ২৫ শতাংশ সুদের হারকে সমর্থন করেছেন ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ন্ত্রণকারক কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান অমলেন্দু মুখার্জি। তিনি বরং আভাস দিয়েছেন সুদের হার বাড়াতে পারলে ক্ষুদ্র ঋণের প্রসার আরও বাড়ানো যাবে।
পুঁজিবাদি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান খুঁটি এই ব্যাংকিং ব্যবস্থা। জনগণের সঞ্চয়, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদিন মাধ্যমে যে অর্থ কেন্দ্রীভূত করা হয়, ব্যাংক তা রুপান্তর করে পুঁজিতে। এই পুঁজি রুপান্তর হয় লগ্নি পুঁজিতে যা উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। আবার সেই উৎপাদনের বিক্রয় থেকে প্রয়োজন আসে বাজারের। ভিন্নভাবে বলতে গেলে, ব্যাংকের সম্প্রসারণ মূলত বাজার সম্প্রসারণের সূত্রপাত। সেক্ষেত্রে, গ্রামীণ জনপদে ব্যাংকিং সেবার সম্প্রসারণের উদ্যোগ বাজার সম্প্রসারণের প্রাথমিক ধাপ হবে। সাবেক ব্যাংকিং বিভাগের সচিব আসলাম আলমের কথায় – “আর্থিক অন্তর্ভূক্তি ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আনতে পারে” – এমনটিই আভাস দেয়। ওই বৈঠকে মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রধান সচিব, ইঙ্গিত করেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হবে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে প্রযুক্তির সাহায্যে ই-কমার্স ও ই-মার্কেট (ইন্টারনেট ভিত্তিক বাজার ব্যবস্থা) সম্প্রসারণ করা।
অন্যদিকে, ব্যাংকের সম্প্রসারণের সঙ্গে জমাকৃত লগ্নি পুঁজি জাতীয় উৎপাদনে যে ব্যবহার করা হবে না, সে কথাটাও পরিষ্কার করা হয়েছে বৈঠকে। সেখানে বিশেষ গুরুত্ব আসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিকাশের। জাতীয় শিল্প বিকাশের ব্যপারটিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।

ক্ষুদ্র-ঋণসব মিলিয়ে, গ্রামীণ অর্থনীতির যে অভূত বিকাশের সম্ভাবনা, তাকে পুরোদমে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ফর্মূলায়। এর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন পণ্যের বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব হবে, তৈরি হবে সুদখোর ব্যাংক ও ক্ষুদ্র ঋণের বাজার। ফলে, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভোগবাদিতার মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ঋণের বোঝা, বাড়বে ব্যাংকের শোষণ। কমিয়ে আনা হবে শহর আর গ্রামের মধ্যে পার্থক্য। আর এর ওপর দাঁড়িয়ে সরকার চিন্তা করছে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচয় লাভ করার।

বি.দ্র. আর্থিক অন্তর্ভুক্তির প্রভাব বোঝার জন্য আরও বিশদ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার বিশ্লেষণ এবং বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ বিবেচনা করা প্রয়োজন।

 

লেখক: রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিক।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*