সুন্দরবন রক্ষার ‘জনযাত্রা’য় ছিলো না শুধু জনগণ

রিয়াজ মোর্শেদ

সুন্দরবন বাঁচাও লং মার্চে (জনযাত্রা) অংশগ্রহণ করলাম ১০-১৩ মার্চ, ২০১৬। আয়োজন করেছে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ- বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি। আমি গিয়েছি ব্যক্তিগত চেতনায়, অনেকটা দায়মুক্তির জন্যই। কারণ নিজেকে কী জবাব দিবো যখন দেখবো সুন্দরবন একটি বাগানে পরিণত হয়েছে? কিংবা কোনও একদিন কেবল ইতিহাসেই থাকবে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নাম!

‘ডানপন্থী’ বাম দলগুলোর আচরণ ছিলো রীতিমত শাসকগোষ্ঠীর মতোই। প্রতিটা জায়গায় এরা আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা চলিয়েছে। আর হ্যাঁ নিঃসন্দেহেই অধিকাংশ বাম সংগঠনের নেতারা শ্রেণিচ্যুত হতে পারেননি বলেই এদের মধ্যে একটা ‘এলিট’ ভাব লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই দেখছি এসি মাইক্রোবাসে চড়ে লং মার্চে অংশ নিয়েছেন।

মহাসমারোহে গেলাম রামপাল অভিমুখে জনযাত্রায়, নিজের আর্থিক দৈন্যকে উপেক্ষা করেও চাঁদা দিয়ে শরিক হলাম সুন্দরবন রক্ষার এই আন্দোলনে। কিন্তু পুরো ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করে ভীষণ আশাহত হয়েছি। বাম দলগুলোর একটা শোডাউনের আয়োজন ছিলো এটা। মহাজোটের শরিক হয়েও সরকারি সিদ্ধান্তকে বিরোধিতা করার সাহস দেখিয়েছে একটি বামদল। তাদের আচরণই আমাকে সবচেয়ে আশ্চর্যান্বিত করেছে। সরকারের উচ্চমহল থেকে রুটি-হালুয়ার ভাগ পায় বলেই তাদের ‘অ্যাসাইনমেন্ট’ পালন করতে এসেছে এই দলটি। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য গড়ে ওঠা বাম দলগুলোর মধ্যে যে কী ধরণের বুর্জোয়াসুলভ আচরণ তা নিজ চোখে না দেখলে বুঝতে পারবেন না। ‘ডানপন্থী’ বাম দলগুলোর আচরণ ছিলো রীতিমত শাসকগোষ্ঠীর মতোই। প্রতিটা জায়গায় এরা আধিপত্য বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রচেষ্টা চলিয়েছে। আর হ্যাঁ নিঃসন্দেহেই অধিকাংশ বাম সংগঠনের নেতারা শ্রেণিচ্যুত হতে পারেননি বলেই এদের মধ্যে একটা ‘এলিট’ ভাব লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই দেখছি এসি মাইক্রোবাসে চড়ে লং মার্চে অংশ নিয়েছেন।

কিন্তু এর পরেও কিছু কথা থেকে যায়, জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্যই তো এ জনযাত্রা, কিন্তু তা পারলাম না কেন? মিডিয়া আমাদের পক্ষে কাজ করেনি তাই? সেটাই স্বাভাবিক কারণ মিডিয়ার উপরেও চাপ থাকতে পারে আর মিডিয়াতো একটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, কোনও দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়।

পুরো যাত্রায় আমার প্রধান পর্যবেক্ষণের জায়গা ছিলো বাম সংগঠনগুলোর ‘প্রতিবাদী’ চরিত্রের ধরণ দেখা। যদিও আমি প্রতিবাদ আশা করতে পারি না সরকারের মন্ত্রীপরিষদে থাকা কোনও ব্যক্তির দল থেকে। কিন্তু এ ছাড়া তো অনেক বামপন্থী দল ছিলো। ঢাকা থেকে রামপাল পর্যন্ত জনযাত্রায় অনেক ছাত্র ও শ্রমিক একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেছিলাম। প্রত্যাশা ছিলো দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক ছাত্র-ছাত্রীসহ সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। কিন্তু জনতার অংশগ্রহণ তেমন নেই বললেই চলে। কিন্তু কেন নেই তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। এখানে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে যেমন- পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের যুগে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আত্মকেন্দ্রিকতার বাইরে চিন্তা করতে পারে না। তাছাড়া দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিস্ট সরকারে যে জনগনকে কোনও দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে না তা জনগণও স্পষ্টভাবেই বোঝে। কিন্তু এর পরেও কিছু কথা থেকে যায়, জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্যই তো এ জনযাত্রা, কিন্তু তা পারলাম না কেন? মিডিয়া আমাদের পক্ষে কাজ করেনি তাই? সেটাই স্বাভাবিক কারণ মিডিয়ার উপরেও চাপ থাকতে পারে আর মিডিয়াতো একটা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, কোনও দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়।

পুলিশ একটু সতর্ক ছিলো, কারণ জনযাত্রার আয়োজকগণ না হোক কর্মী ও সমর্থক কিংবা জনগণ জনযাত্রাকে গণবিক্ষোভে পরিণত করতে পারে। তাই একটু সতর্ক থাকার পাশাপাশি এদের জনযাত্রার মধ্যে একটু মসলা (উত্তেজনা) ঢেলে দিতেই পুলিশি বাধার ‘আয়োজন’

আচ্ছা মিডিয়া ছাড়া কি আন্দোলন গড়ে তোলা যায় না? যদি তাই হয় তবে আমরা যে কথায় কথায় বলে থাকি যে, ‘এগুলো কিছুই না, সব মিডিয়ার তৈরি’ কথাটা নিয়ে বিদ্রূপ করার কোনও কারণ আছে বলে মনে হয় না। মিডিয়াই যদি দায়িত্ব নেবে তবে জনযাত্রা না করে টিভিতে ‘সুন্দরবন বাঁচাও, বিদ্যুৎকেন্দ্র হটাও’ থিমে কিছু বিজ্ঞাপন প্রচার করলেই হতো!

যাই হোক জনযাত্রা যখন ঝিনাইদহ পৌঁছেছে তখন জানতে পারলাম যশোরে পুলিশি বাধা আসবে। যশোরের পুলিশ সুপার বলে দিয়েছেন ওখানে কোনও সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না। অবশ্য সরকারি বাম সংগঠন জড়িত থাকায় আমরা সবাই বেশ চমৎকার পুলিশি নিরাপত্তা পাচ্ছিলাম। কিন্তু পুলিশি বাধা হচ্ছে একটি আন্দোলনের প্রাণ। বাধা আসলেই প্রমাণ হয় কর্মসূচিটি শাসকগোষ্ঠীকে আঘাত করছে। অন্যদিকে সত্যিকার অর্থেই পুলিশ একটু সতর্ক ছিলো, কারণ জনযাত্রার আয়োজকগণ না হোক কর্মী ও সমর্থক কিংবা জনগণ জনযাত্রাকে গণবিক্ষোভে পরিণত করতে পারে। তাই একটু সতর্ক থাকার পাশাপাশি এদের জনযাত্রার মধ্যে একটু মসলা (উত্তেজনা) ঢেলে দিতেই পুলিশি বাধার ‘আয়োজন’।

এরা মার্ক্সবাদ ধারণ করে বলে দাবি করে আবার লেনিনের বিপ্লবী পথকে অনুসরণ করে বলে শোনা যায়, কিন্তু এরা মুক্তির দিশা খোঁজে ’৭২ এর সংবিধানে। ওটাই কারও কারও রাজনৈতিক লক্ষ্য।

যশোরে একটি খোয়াড়ে ঢুকে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করতে হলো আমাদের। ওখানে কেউ কেউ পুলিশ ও সরকারবিরোধী মিছিল দিচ্ছিলো, ওটার সঙ্গেই কণ্ঠ মিলিয়ে একটা মেকি তৃপ্তি বোধ করতে হলো। সত্যিই এই জনযাত্রায় অংশগ্রহণকারী কোনও একটা বাম সংগঠনকে আমার বিপ্লবী রাজনৈতিক ধারা বলে মনে হলো না। আসলে এই যদি হয় বামপন্থীদের চরিত্র তবে শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ সাহেবের বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ( সি.পি.বি, বর্তমানে অনেকে একে বিদ্রূপ করে সিপিভি, কমিউনিস্ট পার্টি অফ ভারতও বলে থাকে) বিলুপ্ত করে আওয়ামী লীগে যোগদান করাকেও অসংগত মনে হয় না। এমন বাম সংগঠনের কোনও দরকার আছে কি? বিপ্লব করার এখন উপযোগী সময় না বলে কেউ কেউ এই ভাটার কালকে নিয়তির হাতেই সঁপে দিয়েছেন দেখছি।

 

CdWDNkyUIAATMTS

 

আসলে পার্টিগুলোর মধ্যে বিপ্লবের চেতনাই নাই চর্চাতো আরও পরের কথা। এরা কেনও সংস্কারবাদী হবে না? কিংবা বিপ্লবের জন্য নির্বাচন কৌশল বেছে নেবে না? সেই যুক্তি খুঁজতেই মত্ত। এমনকি ওদের সহযোগী ছাত্র সংগঠনগুলোকেও প্রধানত এই সব যুক্তিগুলোই শেখানো হয়। এরা মার্ক্সবাদ ধারণ করে বলে দাবি করে আবার লেনিনের বিপ্লবী পথকে অনুসরণ করে বলে শোনা যায়, কিন্তু এরা মুক্তির দিশা খোঁজে ’৭২ এর সংবিধানে। ওটাই কারও কারও রাজনৈতিক লক্ষ্য।

ভেবেছিলাম অন্ততপক্ষে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ, যশোরের এম.এম কলেজ, খুলনার এম.সি কলেজ থেকে একটা বিশাল অংশগ্রহণ থাকবে। কিন্তু বিশাল তো দূরের কথা একটা সামান্যতম অংশগ্রহণ ও চোখে পড়েনি। আসলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যখন পুঁজিবাদী আর সরকার যখন ফ্যাসিস্ট তখন রাষ্ট্রের কোথাও বিপ্লবী চেতনা ধারণা করার কোনও প্রতিষ্ঠান থাকতে পারে না। সেটা হোক রাজনৈতিক দল কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখন প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার অসম প্রতিযোগিতামূলক আত্মকেন্দ্রিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছে শিক্ষার্থীদের। রাষ্ট্র, মিডিয়া কিংবা রাজনৈতিক সংগঠনগুলো বিপ্লবের সপক্ষে থাকা একমাত্র বুদ্ধিজীবী শ্রেণি যে ছাত্র সমাজ তার মধ্যে ভাঙ্গন ধরাতে খুবই সফল হয়েছে।

আসলে এই জনযাত্রার জন্য তেমন কোনও প্রচারণা ছিলোই না। একবার এমনও মনে হয়েছে যে, প্রকৃত জনযাত্রা রুখে দিতেই কি এমন একটা হঠাৎ জনযাত্রা করে অন্যদের প্রস্তুতি নষ্ট করে দেওয়া হলো কি না? জনসম্পৃক্ততার জন্য মিডিয়ার উপর নির্ভর করাই হচ্ছে প্রচলিত ব্যবস্থার কোনও বিকল্প না খুঁজে পাওয়ার হতাশা। আচ্ছা, ভারতের মাওবাদীরা কি জনগণের আস্থা অর্জন করার জন্য মিডিয়ার সাহায্য নিচ্ছে নাকি মিডিয়া তাদের বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে? পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের মিডিয়া কোনও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী রাজনৈতিক ধারার পক্ষে থাকবে না- এটা ধরে নিয়েই কাজ করতে হবে। আর যদি সেটা করার মনোবল, শক্তি ও ইচ্ছা না থাকে তবে আপনারা নিজেদেরকে বাম রাজনৈতিক দল কিংবা মার্ক্সবাদী পরিচয় দিয়ে বিপ্লবের পথ রুদ্ধ করবেন না। বিপ্লবের পথে শত্রু হয়ে আপনারাই নষ্ট করছেন প্রাণ-প্রকৃতি, সুন্দরবনসহ কৃষক- শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

Latest from নির্বাচিত লেখা

labour_2391847f

মে দিবসের ইতিকথা

‘তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান, তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে
গো টু টপ