‘বাঁশি বাজানো বন্ধ করুন, হাতে হাত রাখি চলুন’

কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে ক্রমশ ফুঁসে উঠছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতা-কর্মীরা। বৃহস্পতিবার (২৪ মার্চ) প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর বিক্ষোভ হয়েছে তনুর শহর কুমিল্লায়। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের দাবিতে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন কুমিল্লার সাংস্কৃতিক কর্মীরা।  রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনার সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মীরা অবিলম্বে তনুর হত্যাকারীদের বিচার দাবি করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। অব্যাহত আছে প্রতিবাদ।

কুমিল্লা শহরের বাইরে সেনানিবাস এলাকায় একটি ভাড়া বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন ১৯ বছর বয়সী তনু। ভিক্টোরিয়া কলেজে ইতিহাসে বিভাগে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে  তিনি পড়তেন।  থিয়েটার করার পাশাপাশি নানা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেই যুক্ত ছিলেন তিনি। সন্ধ্যায় টিউশনি করিয়ে ঘরে ফিরতেন তিনি। টিউশনি করিয়ে ঘরে ফেরার পথে গত রবিবার (২০ মার্চ) রাতে ময়নামতি সেনানিবাসের অলিপুর এলাকায় একটি কালভার্টের কাছে তনুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

দেশের নানা প্রান্তের শিক্ষার্থীদের সরব হওয়ার সঙ্গে সোস্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের নামই হয়ে উঠেছে তনু। সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে ক্ষোভ প্রকাশ ও প্রতিবাদের ডাক। ফেসবুক থেকে কয়েকটি স্ট্যাটাস এখানে তুলে ধরা হলো-

রাজনৈতিক কর্মী আদিত্য মাহমুদ লিখেছেন, “…১৯৭১ সালে কেবল মাত্র উর্দির ঙ বা মুখের ভাষাগত ভিন্নতার কারণে পাকিস্থানি সেনাবাহিনী আমাদের শত্রু হয়ে ওঠেনি। সেদিন তারা আমার বোনকে ধর্ষণ করেছিল, হত্যা করেছিল। আর তাই, প্রচণ্ড ক্রোধে প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা আমরা সেই পশুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলাম।
আজ ৪৫ বছর পর কেউ যদি আমার বোনের প্রতি আবারও সেই একই বর্বরতা চালায়, তাহলে সে আমার শত্রুই হবে, বন্ধু নয়। তার প্রতি আমার ঘৃণা, ক্রোধ বা প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা আগের তুলনায় নিশ্চয় এক বিন্দুও কম হবে না। তার উর্দির রঙ বা মুখের ভাষা যাই হোক কেন।
কারণ, মুখের ভাষা বা উর্দির রঙ এ বন্ধু বা শত্রুর পার্থক্য করা যায় না। পরিচয় মেলে কাজে।”

Tanu protest

থিয়েটারকর্মী ও সাংবাদিক সুমন মজুমদার লিখেছেন, “না এ লজ্জা আমাদের নয়। বিশেষ করে আমি এর দায় নেব না। পুরুষ হিসেবে পুরো নারী সমাজের কাছে আমি প্রবৃত্তিটির জন্য লজ্জিত ঠিকই কিন্তু তনুর সহকর্মী কিংবা থিয়েটারকর্মী হিসেবে নই। প্রতি বছর এমন অসংখ্য তনুরা থিয়েটার দলগুলোতে আসে। আমি ভালো করেই বুঝি এবং জানি, এখনো যেখানে আমাদের সমাজে নাটককে ফাটক হিসেবে অভিহীত করা হয় সেখানে মেয়েদের কাছে থিয়েটারের মতো একটা টাইম কিলিং মিডিয়া কতটা কঠিন বিষয়। তারপরও তনুর মতো অসংখ্য মেয়ে নাটককে ভালোবেসেই প্রতিবছর দলে যুক্ত হয়। দলের বাইরে যারা আছেন তারা হয়তো কল্পনাও করতে পারবেন না একটি মেয়েকে আমরা দলের ছেলেরা কতটুকু আগলে আগলে রাখি। রাত-দিন একসঙ্গে কাটিয়েও কোনো দলের একটি মেয়েও কি অভিযোগ করতে পারবে যে, তার কোনো পুরুষ সহকর্মী তাকে শ্লীলতাহানি করেছেন বা নোংরা কথা বলেছেন? আমরা একে অপরের হাত ধরি, শরীরের সঙ্গে শরীর লাগাই নারী বা পুরুষ হিসেবে নয়। সহজাত মানুষ হিসেবে। আমি চাই, ভবিষ্যতে শুধু আরো তনুরাই নয়, আমার বোন, স্ত্রী, মেয়েটিও যেন নাটকের সঙ্গে যুক্ত হয়। কারণ আমি জানি বাইরের তথাকথিত বন্ধুদের থেকে থিয়েটারের বন্ধুদের কাছে সে নিরাপদ।
তাই তনু ধর্ষণ আর হত্যার লজ্জা তাদের, যেসব পুরুষ কেবল বাইরে থেকে কাম তাড়নায় তড়পায়।আমরা থিয়েটারের নাটক-ফাটক করা মানুষরা যদি নিজেদের সংযত করতে পারি, তাহলে অন্যরা কেনো পারবে না? তাই লজ্জার আঙ্গুলটা ওদের দিকেই তাক করা। আমি থিয়েটার কর্মী হিসেবেই তনু হত্যার বিচার চাই।”

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিশাত তুলি লিখেছেন, “…নারী, রুপ নিয়ে নয় সাহস নিয়ে এগিয়ে চল। আর সেটাই হবে আধুনিকতা। তা না হলে একদিন তুমি বা আমি-ই তনু হব। আর আমাদের কারও লাশ পড়ে থাকবে ঝোঁপে। আর রঙ করা চুল থাকবে অগোছালো, নখ গুলো থাকবে নোংরা। কোনও পার্লার তা সারাতে পারবে না ।”

নারীদের উদ্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শওকত শাফি লিখেছেন, “…তনুরা ফিরে আসবে না। কাউকে ক্ষমাও করবে না। তনুদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজের বিবেকের কাছে নির্দোষ হওয়ার কিচ্ছু নেই। ‘তনু হত্যা’র জন্য রাষ্ট্রের সব ধরনের প্রশাসন দায়ী। রাজপথ দায়ী, আবাসিক হল দায়ী। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দায়ী এবং বৈশাখের ঘটনায় যারা ব্যারিকেড ভাঙতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে ঠাণ্ডা আইসক্রিম খেয়ে সচিবালয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন তারাও দায়ী । বুদ্ধিজীবীরাতো বরাবরই হারামজাদা। মানবাধিকার কমিশনের লোকজন আজন্ম শুয়োর। মিডিয়াও তোমার সঙ্গে থাকবে না। ওরা দারুণ ধান্ধাবাজ। ওরা সত্যের পথে নয়, বাণিজ্যের পথে ।

গ্রামের প্রবাদে শুনেছি ,‘ না কাঁদলে মা-ও দুধ দেয় না ।’

কাঁদো নারী। চিৎকার করো। রাজপথে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বকে প্রশ্ন করো … বিউটি পার্লারে স্বাধীনতা থাকে না, মুক্তির জন্য রাজপথ, রাজপথ এবং রাজপথ !”

সাবেক ছাত্রনেতা সামিউল আলম রিচি লিখেছেন, “ …বিচার চাই! কিন্তু বিচারহীনতার সংস্কৃতির সাথে যে জনগণের ক্ষমতাহীনতার সম্পর্ক আছে সেটি বারবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই!… শুধু ২০১৫ তেই ১০৯২ জন নারী ধর্ষিত হয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৩ জন নারী ধর্ষিত হচ্ছেন। এই ভয়ানক চিত্রই বলছে শুধু এক একটা প্রতিবাদ কর্মসূচীই আমাদের নিশ্চিত করতে পারছে না যে, আগামী দিনগুলোতে আমার মা, বোন, বান্ধবী নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবে। … পাহাড় কি সমতলে সব ক্ষেত্রেই ধর্ষকরা ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত। কি সেনাবাহিনী কি সরকারি দলের পাণ্ডা! … ধর্ষকদের হাতেই যখন রাষ্ট্রক্ষমতা তখন একমাত্র জনগণের ক্ষমতাই পারে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে! … তাই বিচার চাই। এবং জনগণের ক্ষমতা দখলের লড়াই বেগবান করতে চাই।”

নাট্যকর্মী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামিনা লুৎফা লিখেছেন, “…তনুর মতো অনেক, অসংখ্য নিপীড়িত নারীর লাশের উপর বসে আমরা ধর্ষিতের বিচার করতে বসি। আর ভাশুরের নাম মুখে নেওয়া যাবে না বলে, ধর্ষকের খবর ধর্ষণের খবর বেশ চেপে -চুপে রাখি। রাস্তায় নামেন এখনো সময় আছে, তাপ কিন্তু গায়ে এসে লাগছে। বাঁশি বাজানো বন্ধ করুন, হাতে হাত রাখি চলুন। পাহাড়ে যখন অবাঙালি নারীদের, শিশুদের ধর্ষণ করা হয়, চুপ থাকেন কারণ সেতো আপনার কেউ না, লেখকরা মরে, অন্য ধর্মের মুক্তিযোদ্ধা মরে, তবু চুপ থাকেন। আর কত! এবার খেলার মাঠ ছেড়ে, একটু জীবনের খেলাটা খেলেন। দেখি আপনাদের ভুল শুধরায় কিনা!”

জাকারিয়া হোসেন অনিমেষ লিখেছেন, “…স্বাধীনতা যুদ্ধে যতো ধর্ষণ হয়েছিলো, যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে বোধহয় সে সংখ্যাটা ইতিমধ্যেই ছাড়িয়ে গেছে। তখন তো পাঞ্জাবীদের দোষ দেয়া যেত এখন?

মনে প্রাণে ধর্ষণ করার উদগ্র বাসনা নিয়ে ঘোরেন এমন মানুষের সংখ্যা কম না। অনেকে সাহস এবং সুযোগ পান না বলেই সম্ভব হয় না। বাসে,  রাস্তায়, ভীড়ের ভেতর দূর থেকে আওয়াজ দিয়ে যেভাবে পারেন কাজটা সেরে নেন। যারা সাহস পান, সেই সাহসটা যোগায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি।

ধর্ষন শুধু একটা অপরাধ না একটা সংস্কৃতি.. এই অপসংস্কৃতি দুই একজনের বিচি কেটে দূর করা সম্ভব না। দরকার সাংস্কৃতিক আন্দোলন। দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলন.. সেটা শুধু কোনও ইভেন্টে গোয়িং বা ইন্টারেস্টেড দিয়ে সম্ভব না।”

-দ্বন্দ্ব ডেস্ক।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

Latest from নির্বাচিত লেখা

labour_2391847f

মে দিবসের ইতিকথা

‘তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান, তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে
গো টু টপ