শাসন যখন দুঃশাসনে রূপ নেয়, মানুষ প্রতিরোধ করবেই

জাকারিয়া অনিমেষ।।

৫২, ৬৯, ৭১ বা ৯০ কোনওটাই দেখার সুযোগ হয়নি। যতটুকু জেনেছি তা ইতিহাসে বা সাহিত্যে। জেনে-শুনে বুঝেছি, সেই প্রতিরোধ ছিল শাসকের বিরুদ্ধে। নিজের দেশের শাসকের বিরুদ্ধে। শাসক যখন শোষক হয়ে ওঠে, তার প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করাটা জনতার অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ দুইশ বছর ইংরেজ শাসকদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। ওই সময়ে ইংরেজদের হয়ে এখানকার স্থানীয় শাসন পরিচালনা করেছে এই উপমাহদেশেরই একটি সুবিধভোগী শ্রেণি। এই একই সুবিধাভোগী শ্রেণি পাকিস্তান আমলেও পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থকে পায়ে দলে নিজেদের পকেট ভারি করেছে। এরাই মুক্তিযুদ্ধে এখানকার মানুষের বিপক্ষে অস্ত্র ধরেছে। অতএব, সব সময়েই দেখা গেছে ক্ষমতাকাঠামোর কাছাকাছি অবস্থান করা একটি শ্রেণি সবসময়েই জনগণের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে নিজেদের গোষ্ঠী ও  ব্যাক্তি স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত ছিল। আর  রাষ্ট্রকাঠামো সবসময়েই এদের রক্ষা করতে তৎপর ছিল।

রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের ভেতর দিয়ে নিজস্ব ভূখণ্ডের মালিক হওয়া বাঙালি জনগোষ্ঠী কি এই শ্রেণির হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে? উত্তরটা আসলে আমাদের আশেপাশেই বিরাজ করছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল এ দেশের মানুষের জন্য গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ, জনগণের স্বার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা। কিন্তু আমরা আজ যদি নিজেদের হিসেবের খাতা খুলে বসি তাহলে দেখতে পাবো, সেই লক্ষ্যের কতটুকু অর্জিত হয়েছে।

স্বাধীনতা পরবর্তী একটা দীর্ঘ সময় আমাদের কেটে গেছে শুধু গণতন্ত্রের সংজ্ঞা খুঁজে। তাই আমাদের আবার আন্দোলনে নামতে হয়েছিল, রাজপথে রক্ত ঝরাতে হয়েছিল নিজেদের শাসকের বিরুদ্ধে। ৯০ এর গণআন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের ঘাড়ে চেপে বসা সামরিক শাসনকে উৎখাত করা গেছে। ফলে অন্তত শাসকের চেহারা পরিবর্তিত হয়ে রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা গিয়েছে। কিন্তু ফলাফল? গণতন্ত্রের প্রতিশব্দ হিসাবে দাঁড় করানো হয়েছে ভোটকে। জনগণকে বোঝানো হয়েছে ভোট দেওয়াই গণতন্ত্র। কিন্ত এই বোধটুকুও সময়ে-অসময়ে পাল্টে গেছে। যে যখন পেরেছে ক্ষমতায় আসার জন্য জনগণের ভোটাধিকারকেও পদদলিত করেছে।

12968047_1067816226613167_4939596223203834430_o

গণতন্ত্র বলতে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর বাস্তবায়ন। রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজ হলো জনগণের মৌলিক অধিকারগুলো প্রাপ্তির পথকে সুগম করা। জনস্বার্থে প্রশাসনকে পরিচালিত করা। এই কাজে বাংলাদেশ রাষ্ট্র কতোটা তৎপর তা বোঝার জন্যে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থানসহ ইত্যাদির দিকে তাকালেই বুঝতে পারব। 

এতোদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্যে টিভি-টকশোতে বুদ্ধিজীবীদের বয়ানে, পত্রিকার জ্ঞানগর্ভ কলাম-সম্পাদকীয়তে আমরা জেনে এসেছি, নির্বাচনে ভোট দিতে পারার অর্থই নাকি গণতন্ত্র। এখন সেই হিসাবও উল্টে গেছে। নির্বাচন ছাড়াই নির্বাচিত হয়ে যায় জনপ্রতিনিধি। তারপর ইদানিং টিভি-টকশো, কলাম-সম্পাদকীয় ঘেঁটে জানা যাচ্ছে এক নতুন তত্ত্ব “সীমিত গণতন্ত্র আর অধিক উন্নয়ন”। ভালো কথা তা উন্নয়নটা কার? জনগণের না কি শাসন কাঠামোতে যুক্ত অল্প সংখ্যক সুবিধাভোগীর? এই প্রশ্নের উত্তর কারও অজানা আছে বলে মনে হয় না।

উন্নয়ন কথাটা শুনলেই ইদানিং ভয়ই লাগে। সরকারের কর্তাব্যাক্তিদের মুখে উন্নয়নের দোহাই দিয়ে সব কিছু জায়েজ করার একটা প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। কেউ কোনও কথা বললেই উন্নয়নবিরোধী তকমা লাগিয়ে দেওয়া হয়। উন্নয়নটা যদি জনগণের জন্যই হয় তাহলে আবার জনগণই কীভাবে উন্নয়ন বিরোধী হয়?

কিছুদিন আগে বাঁশখালীতে নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালিয়ে আটজনকে হত্যা করা হলো। জনগণকে মেরেই যদি উন্নয়ন করতে হয় তা কেমন উন্নয়ন! সুন্দরবনকে ধ্বংস করে ভারতীয় সহয়তায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো হচ্ছে। তার প্রতিবাদকারীরাও নাম ‘কামিয়েছেন’ উন্নয়নবিরোধী হিসেবে। দলীয় এজেন্ডা ও লুটপাটের লীলাভূমিতে পরিণত হয়েছে উন্নয়নের নামে দরকারি-অদরকারি প্রজেক্টগুলো। এর বিরোধিতা কি? এর গঠনমূলক সমালোচনার নামও দেওয়া হচ্ছে উন্নয়ন বিরোধিতা। শুধু বিল্ডিং তথা দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণ উন্নয়ন হতে পারে না। এগুলো উন্নয়নের নামে স্টান্টবাজি ও লুটাপাটের আখড়া। আর এ উন্নয়নের ফলভোগী সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নয় সংখ্যালঘিষ্ঠ ক্ষমতাকাঠামো কেন্দ্রিক স্বার্থান্বেষী মহল।

দেশে নামেমাত্র ব্যতিত বিরোধী দল নেই। কিন্তু একদলীয় শাসন চালাতে বিরোধীপক্ষ খুবই জরুরি। কাউকে না কাউকে তো ব্লেইম করতে হবে। ফলে সরকার হয়ত প্রতিপক্ষ হিসেবে জনগণকেই বেছে নিয়েছে। জনগণও একদম নিরব দর্শকের ভূমিকায় বসে নেই। যেখানে তার স্বার্থে আঘাত লেগেছে, প্রতিরোধ ছাড়া যেখানে আরও কোনও উপায় নেই, সেখানে তারা ঠিকই নেমে এসেছেন।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে,শাসন যখন দুঃশাসনে রুপ নেয় মানুষ প্রতিরোধ করবেই। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অগ্রগতিতে ছাত্রদের ভূমিকা বরাবরই প্রধান ছিল। ৭১ ছিল ৪৮ পরবর্তী ছোট-বড় বিক্ষোভ প্রতিরোধের চুড়ান্ত রুপ। তেমনি ৯০ ছিল ৭১ পরবর্তী মানুষের ক্ষোভ প্রতিবাদের চূড়ান্ত রুপ। এরপরে একটা দীর্ঘ সময় কেটে গেছে। গণতন্ত্রের নামে নাটক দেখতে দেখতে জনগণ ক্লান্ত। জনগণের ঘাড়ে বন্দুক রেখে দলীয় ও ব্যক্তি স্বার্থের রাজনীতি করে ইতোমধ্যেই জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে একঘরে হয়েছে বড় একটি রাজনৈতিক দল। এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে জনগণকেই একঘরে করার পাঁয়তারা করছে ক্ষমতাসীন দল। নানা ধরনের বিধি-নিষেধ আরোপ করে জনগণের ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে একদলীয় শাসন। কিন্তু এভাবে তো আর জনগণকে দাবিয়ে রাখা সম্ভব নয়।

গত বছর হঠাৎ করে শিক্ষার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকারের ওপর ভ্যাট আরোপ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। তারা হয়ত ভেবেছিল, অসংগঠিত জনতা এটি মেনে নেবে। কিন্তু ছাত্র সমাজ যখন রাজপথে নামে তখন সেই শক্তির সামনে কোনও কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তাই দেশ অচল করা আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। এরপরে গত ২০ মার্চ কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হলো কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। আরও অনেক ঘটনার মত এটাকেও ধামাচাপা দিতে চেষ্টার কমতি ছিলো না প্রশাসনের। কিন্তু কুমিল্লার ছাত্র সমাজ ও জনগণের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ফুঁসে উঠেছে সারাদেশের মানুষ। যার প্রেক্ষিতে বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা অবরোধ, সারাদেশের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান সমূহে ধর্মঘট পালনের পর ২৫ এপ্রিল সারাদেশে অর্ধ-দিবস হরতাল ডেকেছে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো। এই প্রতিবাদ শুধু তনুর জন্য নয়। দেশে আশংকাজনক হারে যে খুন ধর্ষণ বেড়েছে তারই বিপক্ষে জননিরাপত্তার জন্যেই সামাজিক প্রতিরোধ। এরপরেও সরকারের তরফ থেকে কোনও পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কি পুরো প্রশাসন কাউকে বাঁচাতে চাচ্ছে? তারা কারা? জনগণের চেয়েও কি তারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

লেখার একদম শুরুতে বলছিলাম একটা গোষ্ঠী ক্ষমতা কাঠামোর কাছাকাছি থেকে সবসময়েই জনগণের বিপক্ষে কাজ করে গেছে। কিন্তু ইতিহাস বলে তাদেরকে জনগণ ছেড়ে দেয়নি। তাদেরকে উৎখাত করে করেই জনগণ নিজের এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করেছে। সরকারের বোঝা উচিত পরপর দুটি বছর রাজপথ কেঁপেছে বিভিন্ন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। তারমানে অতীত থেকে যদি শিক্ষা নেওয়া যায় তাহলে এখনই রাষ্ট্রের পরিচালনাকারীদের সচেতন হতে হবে। না হলে অতীত ইতিহাস যে বার্তা দেয় তা সরকারের জন্য ইতিবাচক কিছু নয়। দুর্নীতি, অর্থলোপাট, খুন, গুম, নীপিড়ণ, ধর্ষণ ইত্যাদির মতো ভয়াবহ ও জঘন্য অন্যায় যদি রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়ে চলতে থাকে,তাহলে মনে রাখা উচিত এই দেশের জনগণ একই অন্যায়ের জন্য পাকিস্তানকে ছাড় দেয়নি, সামরিক শাসনকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। তাই জনগণের পালস বোঝার চেষ্টা করুন। জনগণ ক্ষেপলে কাউকে ছেড়ে কথা বলবে না। জনগণের ট্যাক্সের টাকায়, রেমিট্যান্সের টাকায় উন্নয়নের দামামা বাজিয়ে গেলেই যে সবাই চোখবুজে সব মেনে নেবে তা কিন্তু নয়।

কোনও আন্দোলন কখনও ব্যর্থ হয় না। প্রতিটি আন্দোলন মানুষের মনে নেতিবাচক-ইতিবাচক কোনও না কোনও প্রভাব রাখবেই। তাই তনুর কথা বলি আর সুন্দরবন বা বাঁশখালি অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক, শেয়ার বাজারের অর্থ লোপাটের কথা বলি। মানুষ এগুলো ভুলে যাচ্ছে না। মানুষের সচেতনতায় এসব ছাপ রেখে যাচ্ছে। যদি ভাবা হয় ধামাচাপা দিয়ে দিয়ে এসবকে আড়াল করা যাবে, তা বাস্তব বা ইতিহাসের শিক্ষা সম্মত নয়। এগুলোই ভবিষ্যতের বৃহৎ বিক্ষোভে জ্বালানি হয়ে কাজ করবে।

জনগণই ইতিহাস গড়েছে, জনগণই ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণ করেছে এবং করবে। জনগণই ঔদ্ধত্য দেখাবে, শাসক নয়। শাসকের ঔদ্ধত্য তার পতনের সূত্রপায় ঘটায়। জনবান্ধব না হলে রাষ্ট্রের খোলস ছুঁড়ে ফেলে জনগণই তার কাঙ্ক্ষিত মুক্তির পথ করে নেয়, এর সাক্ষী পৃথিবীর ইতিহাস।

শেষ কথা, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকনা যেমন মহাদেশ গড়ে তোলে, তেমনি এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিরোধই নতুন দিনের ডাক দিয়ে ভালো কিছু নির্মাণের পথকে সুগম করবে। আন্দোলন কখনও ব্যর্থ হয় না। ব্যর্থ হয় দমন প্রক্রিয়া। দিন শেষে জয় জনতারই হবে। এটা বুঝতে পারলে ভালো, না হলে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি খুব বাজেভাবে ঘটতে পারে।

লেখক: তনু হত্যার প্রতিবাদ ও বিচারের দাবিতে আন্দোলনরত একজন কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

Latest from নির্বাচিত লেখা

labour_2391847f

মে দিবসের ইতিকথা

‘তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান, তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে
গো টু টপ