মুভ্যি রিভিউ: ‘ফেস টু ফেস’ এই পঁচে যাওয়া সমাজের কথা বলে

আদিত্য মাহমুদ।।

একজন কবি অথবা পলাতক পিতা; যে হত্যা করেছে প্রেমিকার গর্ভের সন্তানকে। এক ভয়ানক তীব্র অপরাধবোধ তাকে খুন করে চলছে প্রতিনিয়ত। প্রতি মুহূর্তে নিজের কাছেই ক্ষয়ে যাচ্ছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা। আজ সে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি। এমন সময় তার পরিচয় হয় লক্ষ্মী’র সাথে। লক্ষ্মী একজন ‘বাজারি’ মেয়ে। এ সমাজ ব্যাবস্থা যাদের টানবাজার থেকে শুরু করে শহরের অন্ধকার রাস্তার মোড়ে দাঁড় হতে বাধ্য করেছে। এখান থেকেই শুরু হয়েছে  সাহাদত রাসেল এর স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ফেস টু ফেস’ এর পথ চলা।

maxresdefault

এরপর নগরীর ঘুমন্ত রাস্তায় সোডিয়ামের জোৎস্নায় চলতে থাকে দুজনার কথোপকথন। কথার স্রোতে ভেসে ওঠা ওদের জীবনের অনেক কথা। সেই সাথে একে একে সামনে আসতে থাকে সমাজের নানান অসংগতির চিত্র। এখানেই পরিচালক রাসেল সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। বিশেষত, এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বর্ণিল সজ্জার নিচে লুকিয়ে থাকা পশুত্বকে তুলে এনেছেন নির্মোহভাবে। তুলে ধরেছেন নারীদের প্রতি চলমান নির্মম বৈষম্যের কিছু ক্ষত।

‘ফেস টু ফেস’-এ প্রচলিত ধর্মীয় চেতনার ঘাড়ে চেপে বসা কূপমুণ্ডুকতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বেশ জোরালোভাবে। এর বিপরীতে বলা হয়েছে মানব ধর্মের কথা। এছাড়াও প্রশাসন, সরকার, রাষ্ট্র সর্বোপরি সম্পূর্ণ সমাজ কাঠামোর দিকে পরিচালক আঙ্গুল তুলেছেন। প্রকাশ পেয়েছে গভীর ক্ষত, হতাশা, যন্ত্রনা আর জমাট বাঁধা ক্ষোভ। তবে এসব অসংগতির পেছনের মুল কারণ এখানে খতিয়ে দেখা হয়নি। এমনকি, ক্ষত সারিয়ে তোলার উপায় বিষয়ে স্পট বক্তব্য অনুপস্থিত। হয়ত পরিচালক শুধু কিছু প্রশ্ন তুলে ধরতে চেয়েছিলেন! হয়ত মাত্র ১৯ মিনিট দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রে সমাজের সামগ্রিক সমস্যাবলির বিস্তারিত বিশ্লেষনের দাবি করাটা অবিচারের সামিল! তবে বেশ কিছু সংলাপ এর মধ্যে দিয়ে পরিচালক রাসেলের ভেতরের যন্ত্রনা আর জ্বলতে থাকা বিদ্রোহের আগুন যেমন পরিষ্কার দেখা যায়, তেমনি অধিকাংশ মানুষের মাঝে এই পচনধরা সমাজ ভেঙ্গে ফেলার আকাঙ্ক্ষা যে ক্রমেই দানা বাধতে শুরু করে এমন ইঙ্গিত বেশ পরিস্কারভাবে পাওয়া যায়।

তৌফিক নাওয়াজ এর সিনেমাটোগ্রাফি; অথবা হুমায়ারা হিমু ও জামশেদ শামীম এর অভিনয়; কিম্বা পার্থিব রাশেদ ও বায়জিদ প্রিন্স এর এডিটিং, অথবা অন্য সকল বিভাগ সহ পুরো ‘ফেস টু ফেস’ চলচ্চিত্র টির নির্মাণ শৈলী, শিল্পমান, আঙ্গিক ও কলা কৌশল নিয়ে প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক, বা ব্যাখা-বিশ্লেষন করা যেতে পারে। তবে, এসব কিছুকে ছাপিয়ে এর বিষয়বস্তু ও বক্তব্য অন্যদের থেকে এই চলচ্চিত্রকে আলাদা করে তুলেছে।

চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক শাহদাত রাসেলের ‘ফেস টু ফেস’ চলচ্চিত্রের দৃষ্টিভঙ্গী বিশেষভাবে লক্ষনীয় এবং প্রশংসাযোগ্য। এই চলচ্চিত্রে সচেতনভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে যে; নারী কোনও সম্ভোগযোগ্য মাংসপিণ্ড নয়। তার প্রথম পরিচয় সে একজন মানুষ। সে একজন প্রেমিকা… একজন মা… পুরুষের একান্ত আশ্রয়স্থল। পরিচালক সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় এখানে হাজির করেছেন তা হল তিনি সমাজ বিচ্ছিন্নভাবে কেবল ব্যাক্তি জীবনের স্বপ্ন, ক্ষোভ,আকাঙ্ক্ষা, হতাশার মাঝে তার চলচ্চিত্রকে বেঁধে রাখেননি। তিনি বরং ব্যাক্তি জীবনকে সমাজ জীবনের অংশ হিসেবে, সমাজ বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়ে সামগ্রিকভাবে দেখার চেষ্টা করেছেন।  যা বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। একই কারণে অন্যদের জন্যও অনুসরণীয়।

স্বল্প দৈর্ঘ চলচ্চিত্রটি দেখতে পারবেন এই লিংকে:

https://z-1-video-sin1-1.xx.fbcdn.net/v/t42.1790-2/13294950_181494952250826_546335745_n.mp4?efg=eyJ2ZW5jb2RlX3RhZyI6InN2ZV9zZCJ9&oh=c77fc37a38a810f116750a023f03a1fc&oe=5749A201

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*