সুন্দরবনের রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র: যে কথাগুলো কেউ বলছে না

সুজিত সরকার।।

নরেন্দ্র মোদি যখন ঢাকা সফরে ভারতের ব্যবহারের জন্য মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরগুলো নিশ্চিত করে গিয়েছিলেন তখন শীর্ষ ভারতীয় পত্রিকা দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া শিরোনাম করেছিল  “Now India gets to tug at China’s string of pearls” (চীনের স্ট্রিং অব পার্লস-এ ভারতের আধিপত্য বিস্তার)। ভারতীয় পত্রিকাটির শিরোনামটাই বুঝিয়ে দেয় যে, বঙ্গোপসাগর এলাকায় ভারতের আধিপত্য বিস্তার কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং এর ওপর আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণ কতটা নির্ভরশীল। মংলা বন্দর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প এই সমীকরণেরই একটি অংশ।

প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর জুড়ে চীন কিছু ভূ-সামরিক কৌশলগত অবস্থান চিহ্নিত করেছে, যাকে আমেরিকার বিশেষজ্ঞরা ‘মুক্তার মালা’ বা string of pearls হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যে কোনও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে চীনকে ঘেরাও করার জন্য এই সামরিক অবস্থানগুলোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেটে এই স্ট্রিং অব পার্লস যথেষ্ট পরিষ্কারভাবে চিহ্নিত করা আছে। সেখানে দেখা যাবে, একাধিক সামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানের মধ্যে একটি বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর। অন্যদিকে সীমান্তবিরোধ এবং ভূরাজনৈতিক কারণে আন্তর্জাতিকভাবে ভারত প্রতিবেশী চীনকেই প্রধান শত্রু হিসেবে শনাক্ত করেছে। এই সমীকরণ নরেন্দ্র মোদি স্পষ্ট করেছেন তার আমেরিকা সফরে। তিনি বারাক ওবামাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পার্টনার। আর তাই, বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি অবস্থানে যেমন বাগেরহাট, মহেশখালীর মতো উপকূলীয় অঞ্চলে দেখা যাবে ভারত এবং চীনের পাল্টাপাল্টি বহু কর্মসূচি।

সুন্দরবনে ক্ষতিকর রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প দিয়ে আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পাওয়ার পরপরই কোনও কালক্ষেপন না করেই মোদি বিশেষ নজর দেন বঙ্গোপসাগর এলাকায়। বাংলাদেশের সাগরে নিজেদের অবস্থান জোরালো করার উদ্যোগে মোদি ভারতীয় মালবাহী জাহাজগুলোর জন্য মংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন। বঙ্গোপসাগরে প্রভাব বাড়াবার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তি করলেন সাগরের ব্লু ইকোনমি (blue economy) নিয়ে গবেষণা করার। আম্বানি পরিবারকে দিয়েছেন কক্সবাজারের মহেশখালীতে টার্মিনাল নির্মাণ কাজ। বাংলাদেশের কাছ থেকে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ ইজারা নেওয়ার চুক্তি।

সমুদ্রের পাশাপাশি, বাংলাদেশের স্থলভাগে আরও জোরদার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে অসম ট্রান্সিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, গড়ে তোলা হচ্ছে ভারতীয় ইকোনমিক জোন। বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান-ভারত (বিবিআইএন) আন্তঃদেশীয় সড়ক যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-শিলং-গুয়াহাটি ও কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে – যার মধ্য দিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহী বা সন্ত্রাসী তৎপরতা দমনের সুযোগ প্রসারিত হবে। এছাড়া, রামপালের বিদ্যুৎ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার তৎপরতা আছে।

কেন সরকার সুন্দরবন চায়, আবার ভয়ও পায়

গত বছর ডিসেম্বরে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসাইন মুহম্মদ এরশাদ ভারত সফরে গিয়ে নিরাশ হয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ভারত জাতীয় পার্টিকে যথাযথ বিরোধী দল হিসেবে মূল্যায়ন করছে না। তাই, তারা এরশাদের মাধ্যমে খবর পাঠিয়েছে দ্রুতই নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির কানেও এ খবর পৌঁছেছে। আর তাই তারা এখন সরকারকে প্রতিনিয়তই অনুরোধ করে যাচ্ছে নির্বাচনের জন্য সংলাপ আহ্বান করার।

এককভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ক্ষমতায় আসা অওয়ামী লীগ সরকারের জন্য এটা আশনি সংকেত। ভারতকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সবকিছু দেওয়ার পরও এ মূল্যায়নে সরকার শঙ্কিত। ২০১০ সালে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মানমোহন ‍সিং এর সফরকালে যৌথ অংশীদারিত্ব চুক্তি থেকে শুরু করে মোদির সফর পর্যন্ত অনেকগুলো জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি বাংলাদেশ সরকারকে করতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কুক্ষিগত করে এই জাতীয় স্বার্থবিরোধী কর্মসূচীগুলো বাস্তবায়ন করায় – যেমন রামপাল, ট্রান্সিট, বাণিজ্য সমঝোতা, লাইন অব ক্রেডিট ইত্যাদি – আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমিয়েছে।

বিশেষ করে সুন্দরবনের ইস্যু জনগণের মধ্যে সাড়া জাগিয়ে তোলার কারণে আওয়ামী লীগ আরও বিপাকে পড়েছে। এই গণজোয়ারের কৃতিত্ব অবশ্যই সাধারণ জনগণের। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ কতটা নার্ভাস, সে পরিচয় প্রধানমন্ত্রী নিজে দিয়েছেন – রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষে সংবাদ সম্মেলন করে। এভাবে, ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগ একদিকে ভারতের কাছে উদারতার দুয়ার খোলা রাখতে বাধ্য হচ্ছে, অন্যদিকে সে শঙ্কিতও হচ্ছে।

তবে, এটা বলা যাবে না যে, আওয়ামীলীগ একেবারে প্রস্তুত নয়। পাল্লা সমান করার সব রকম আয়োজনই দলটির আছে। একদিকে সরকার জনগণের কণ্ঠরোধ করছে, অন্যদিকে গণমাধ্যমকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসছে। একই সঙ্গে ভারতের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের জন্য নতুন করে দুয়ার খুলছে। হয়ত এ মাসের মাঝামাঝি চীনের প্রেসিডেন্টের সফরেই পাশার দান উল্টে যেতে পারে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুসারে, চীন আসছে একাধিক প্রস্তাব নিয়ে। বাংলাদেশের সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকার কাজসহ পাঁচ বছরের পার্টনারশিপ প্রস্তাব নিয়ে। থাকছে বঙ্গবন্ধু সেতুতে নতুন রেল যোগাযোগ স্থাপন, পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উন্নয়নসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাব। আর এই সফরের গুরুত্ব অনেক আগে থেকেই দিয়ে আসছে সরকার। গণমাধ্যমের খবরে প্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীর ভাষায় চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্কের বিষয়ে এসব তথ্য পাওয়া যাবে। আর, ইতিমধ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চীনা কোম্পানিগুলোর বিদ্যমান অনেক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ রয়েছে কুষ্টিয়ায়, মহেশখালী এবং কক্সবাজার এলাকায়।

চীনকে গুরুত্ব দিয়ে ভারতকে হুঁশিয়ার করাতেই সরকার ক্ষান্ত নয়। দেশের ভেতরে যাতে সরকারবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি না পায় সে জন্য বিরোধীদেরও চাপে রাখতে হচ্ছে সরকারকে। যার প্রমাণ পাওয়া যায় রামপাল-বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে এবং তার পরবর্তী সময়ে। এ সময়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের একটা লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যায় – তা হলো, নগ্নভাবে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পক্ষালম্বন করা। এধরণের পরিবর্তন এতটাই আচমকা এবং মৌলিক যে, বাধ্য হয়ে ভাবতে হয় যে নিশ্চই কোনও অশনি সংকেত দেখে সাংবাদিকগণরা সব সটকে পড়েছেন – চাইছেন শক্তের আশ্রয়। সুন্দরবনের পক্ষে আন্দোলনের প্রতি উদাসীনতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ সাইকেল র‌্যালির উপর পুলিশ-ছাত্রলীগের বাধার খবরটি চেপে রাখা।

রামপাল-বিরোধী আন্দোলনে আসতে পারে দমন

বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সমীকরণে অবস্থান, সাংবাদিকগণদের দেউলিয়াপনা এবং প্রধানমন্ত্রীর নার্ভাস অবস্থান দেখে এটাই পরিষ্কার যে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঠেকিয়ে দিলে জনগণকে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। শিখতে হবে আন্দোলনের কৌশল এবং নীতি। নিরীহ সাইকেল মিছিলকে (আয়োজকদের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি) যদি এতটাই গুরুত্ব দিতে হয়, যে সেটাকে থামাবার জন্য ৫০০ ছাত্রলীগের কর্মী, পুলিশ এবং জলকামানের প্রয়োজন হয়, তাহলে বুঝতে হবে সরকার এ নিয়ে কতটা স্পর্শকাতর ভূমিকায় আছে।

সামনে আসছে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ রক্ষা জাতীয় কমিটির মহা আয়োজন। সুন্দরবনকে রক্ষার তাগিদে নভেম্বর মাসের শেষার্ধে ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচী ও মহাসমাবেশ। এটাকে ঘিরে আন্তরিক নেতাকর্মীরা যেমন প্রস্তুতি হচ্ছে, তেমনি পাল্টা প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। চারিদিকের আভাসমতে, সে আন্দোলনের ওপর আসতে পারে দমন-নির্যাতন। ফলে এখনই সজাগ হতে হবে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র বিরোধী আন্দোলনকারী সবাইকে। নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় ও সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকায় নামতে হবে।

 

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

Latest from রাজনীতি

গো টু টপ