দূর্গা নয়, মহিষাসুর থেকে শিক্ষা নিন

সুজিত সরকার।।

বিষ্ণু, শিব ও ব্রহ্মার মুখমণ্ডল হতে মহাতেজ পুঞ্জিভূত হয়ে মহিষাসুরমার্দিনী দূর্গার আবির্ভাব ঘটে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে। সনাতন ধর্মের এই তিন মহাদেবতা শুকা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিথিতে এই দূর্গা দেবিকে পূজা করেন এবং দশমীতে দেবি মহিষাসুর বধ করেন। সেই থেকেই মহিষাসুরমার্দিনী দূর্গা শক্তির দেবতা। বিজয়ীদের ইতিহসে এভাবেই দূর্গা মহিমান্বিত, আর পরাজিত হয়ে মহিষাসুর ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণ্য খলনায়ক।

durgaপরাজিত হওয়া অসুরদের রাজা মহিষাসুর ছিলেন রম্ভাসুর নামে এক অসুরের পুত্র। পুরাণ অনুসারে ব্রহ্মা মহিষাসুরের বন্দনায় মুগ্ধ হয়ে বর প্রদান করতে চান। মহিষাসুর অমরত্ব চেয়েছিলেন, ব্রহ্মার উত্তর ছিল- “এ বর শুধু দেবতাদের জন্য”। পরবর্তীতে ব্রহ্মা মহিষাসুরকে ত্রিভূবন জয় করতে পারার মতো বর দেন, নারী ব্যতিত অপরাজেয় হয়ে থাকার আশীর্বাদ দেন। আশীর্বাদ পেয়ে মহিষাসুর স্বর্গলোক জয় করলেন, বিতাড়িত করলেন দেবালোকের দেবতাদের। মহিষাসুরের কথিত দুঃশাসনের ফলস্রুতিতেই দূর্গার জন্ম, যিনি অসুরবধ করে দুর্গতিনাশিনী হয়ে ইতিহাসে জায়গা নেন।

যুগে যুগে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস বিজয়ীদেরই। সেভাবেই রাজা আলেক্সান্ডার হয়েছেন ‘দি গ্রেট’, খ্রিস্টান চার্চের ক্রুসেডকে (crusade) করা হয়েছে জায়েজ, উত্তর আমেরিকার আদি বাসিন্দাদের গণহত্যা দেওয়া হয়েছে কবর। আর আফ্রিকায় জাতিসংঘের আগ্রাসনকে বলা হয়েছে শান্তিরক্ষা। আর রাষ্ট্র-সমাজ সব সময়েই এই বিজয়ীদের। এই বিজয়ীরাই ২০০০ বছর ধরে দাসযুগকে দিয়েছিল বৈধতা, জমিদারকে কৃষকের ঘাড়ের ওপর আঘাত করার ছড়ি আর গুটিকয়েক লোককে পৃথিবীর ৭০ ভাগ সম্পদ ভোগ করার অধিকার। পাশাপাশি, পরাজিতরা পেয়েছে অনন্তকালভর খলনায়কের খেতাব। আর নিপীড়িতদের কর্মকাণ্ডের কথা সে ইতিহাসে কোনও ঠাঁই পায়নি। কোনও প্রশ্নকেই এর মাঝে কখনও স্থান দেওয়া হয়নি। করা হয়েছে দমন।

মহিষাসুরের দেবালোক চ্যলেঞ্জ– সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

দেবালোক সে দেবতাদের স্থান। বিমূর্ততে এই দেবালোকের অবস্থান মাথার ওপরে, কারণ দেবতারা পূজনীয়। সেখানে বসবাস, আনাগোনা করে ৩২ কোটিরও অধিক দেবতা-দেবী। এদের রাজা ইন্দ্র হওয়ায়, দেবালোকের অন্য নাম ইন্দ্রলোক। শাস্ত্রমতে, এরা এক একেকজন এককেকটি ক্ষমতার অধিকারী– কেউ বিদ্যার, কেউ ধন-সম্পদের, কেউ বা শক্তির,কেউ সংগীতের। মর্তলোকে বসবাস করা সাধারণ জীব যদি কোনও গুণ বা বিদ্যার সান্নিধ্য পেতে চান, তবে সে নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতের দেব/দেবীর আরাধনা না করে তা পাবেন না। এটাই মর্তলোকের নির্মম নিয়ম।

মর্তলোক তৈরিতে ছিলেন ব্রহ্মা, লালনে বিষ্ণু আর সংহারে শিব– যারা কিনা মহাদেবতা এবং দেব-দেবীদেরও পূজনীয়। উনারা মর্তলোককে এমনই জালে আবদ্ধ করেছিলেন যে দেব-দেবীদের ছাড়া মানুষ্যগণ এবং অন্যান্য নশ্বর জাত অসহায়। ধরনীর সার্বজনীন কানুন তৈরিতে তারা কোনও অংশেই একজন শাসকের চাইতে কম যাননি। প্রজারা, অর্থাৎ মানুষ্য ও নশ্বর জীব, থাকবে রাজার অধীন। আর স্বাধীনতা চাইবা মাত্রই কেড়ে নেওয়া হবে সকলেরই। সেই সঙ্গে, দোবলোক কোন অংশে এক শাসকের প্রাসাদের চাইতে কম যায়নি। সারাদিন নাচ-গান-ফূর্তিতে উন্মত্ততা, প্রজাদের ঘাড়ে ছড়ি ঘোরানো এবং বেলাশেষে বিচার– অধীনতা অমান্যতায় দণ্ড আর পূজায় ফল স্বর্গ।

হিন্দু পুরাণে মহিষাসুর একমাত্র মর্তলোকের নশ্বর এবং ইতিহাসের খলনায়ক যে কিনা দেবালোককে চ্যলেঞ্জ করেছিল। যুগান্তরের দোবলোকের কানুনকে করেছিল প্রশ্ন এবং উদ্ধত শিরে বলেছিলেন: “মানি না, এ অন্যায়”। এত বড় দুঃসাহস পুরাণে আর কারও হয়নি।

উল্লেখ্য, একজন মহাদেবতাই মহিষাসুরের জন্ম দিয়েছিলেন– যেমন দাস মালিকেরাই ইতিহাসে দাস বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন আর ভূ-স্বামীরাই ফরাসি বিপ্লবের। প্রকৃতির নিয়মানুসারেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্ম।

এখানে বিতর্ক আসতে পারে, মহিষাসুর ছিলেন দুঃশাসক– স্বর্গ-মর্তে সৃষ্টি করেছিলেন ত্রাস, ঠিক যেমনটি পুরাণ বলে। কিন্তু, দেখা যাবে, মহিষাসুর স্বর্গজয় করেও দেবতাদের ভূমিকা হাতে তুলে নেননি, স্বর্গের বিলাসীতায় নিমত্ত হয়ে যাননি। তিনি নেমে এসেছিলেন মর্তে, যেখানে মহিষাসুরমার্দিনী দূর্গা তাকে করেন বধ। আর তাই, পূজা শেষে বিসর্জনের মাধ্যমে দূর্গাকে বিদায় দেওয়া হয় এই মর্মে যে তিনি স্বর্গলোকে ফেরত যাবেন। আর পুরাণেও আছে, মহিষাসুর স্বর্গে সৃষ্টি করেছিলেন ত্রাস– দেবতাদের জন্য তিনি তো ত্রাস হবেনই। আর দেবতাদের শাসনকালে যে মর্তলোকে শোক-দুঃখ-জরামুক্ত ছিল এমনটি তো কোথাও লেখা নেই।

দূর্গা– পুরুষের হাতে তৈরি পুতুল

মহাদেবের তেজে মুখ, যমের তেজে চুল, বিষ্ণুর তেজে বাহু, চন্দ্রের তেজে স্তন, ইন্দ্রের তেজে কটিদেশ, বরুণের তেজে ঝঙ্ঘা ও উরু, পৃথিবীর তেজে নিতম্ব, ব্রহ্মার তেজে পদযুগল, সূর্যের তেজে পায়ের আঙুল, বসুগণের তেজে হাতের আঙুল, কুবেরের তেজে নাসিকা, প্রজাপতির তেজে দাঁত, অগ্নির তেজে ত্রিনয়ন, সন্ধ্যার তেজে ভ্রূ, বায়ুর তেজে কান এবং অন্যান্য দেবতার তেজে শিবারূপী দুর্গার সৃষ্টি। অর্থ্যাৎ, দেবী দূর্গার নিজ কোনও সত্বা নেই, তিনি স্বাধীন স্বাবলম্বী কোনও দেবী নন। দেবদের সমষ্টিগত একজন সত্বা মাত্র।

মূর্তিতে একজন নারী এবং ক্ষমতায় শক্তির দেবতা হওয়ায় দূর্গা মানুষ্য নারীর একজন উপাস্য দেবী। অনেক জায়গায়, নারীবাদের সংজ্ঞার সঙ্গে দূর্গার উদাহরণ টানা হয়। কিন্তু বাস্তবতায়, মহিষাসুরমার্দিনী দূর্গার নিজ কোনও সত্বা নেই। পুরুষ দেবসমাজ তাকে যেভাবে রুপ দিয়েছে, তিনি সেই রুপই ধারণ করেছেন। ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’ যে ব্রত তিনি জপেছেন, সেই দুষ্ট দেবালোকের চোখে দুষ্ট পাত্রই। দেবালোকের চোখে শিষ্ট মর্তলোকের জীবেরাই পেয়েছে দূর্গার পালন। দূর্গা নিজে কোনও বিচার করেননি।

ইতিহাসে নারীর বাস্তবতাটাও সমান করুণ। পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞানী হওয়া সত্বেও পুরুষশাসিত সমাজের প্রবর্তন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নারীকে হয়ে যেতে হয়েছে পুরুষের হাতের পুতুল। ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়া মাত্রই নারীকে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে ঘরের কোণে, মর্জাদাহীন অবস্থায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে গেরস্তির কাজ ‍আর সন্তান লালনের একচ্ছত্র দ্বায়িত্ব। সে পুরুষের প্রয়োজনেই হয়েছিল। এখন আবার যখন তাকে ঘর থেকে বের করে কথিতভাবে স্বাধীন করা হয়েছে আবার সংসার-রান্নাঘরের সঙ্গেও জড়িয়ে রাখা হয়েছে, তাও হয়েছে পুরুষের প্রয়োজনে। প্রয়োজন হয়েছে বলেই টেনে এনে বানানো হয়েছে পণ্য, সাজানো হয়েছে মোড়কে।

দূর্গাকে নারীর সর্বোৎকৃষ্ট অবয়ব এবং ক্ষমতার সঙ্গে তুলনা করাটা অত্যান্ত মর্জাদাহানিকর। শক্তির দেবতা হিসেবেও তিনি বিভ্রান্তিকর– কারণ দূর্গা প্রতিষ্ঠা করেন যে, ‘শক্তির উৎস পুরুষ একাই’।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

Latest from রাজনীতি

গো টু টপ