সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয় কমিটির আন্দোলন নিয়ে কিছু প্রশ্ন

আহনাফ আতিফ অনিক।।

সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দেশগুলোর জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন করা সাম্রাজ্যবাদের একটি সাধারণ কর্মসূচী। বাংলাদেশ সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত একটি দেশ। সুতরাং এখানে জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠনের পাঁয়তারা সর্বদা বিরাজমান। সাম্রাজ্যবাদ এখানে তার নতুন নতুন উন্নয়নের মডেলের মাধ্যমে জনগণকে ধোঁকা দিয়ে জাতীয় সম্পদ লুণ্ঠন করতে চায়। আর তার সমস্ত কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করে এ দেশের দালাল সরকার। যার উদাহরণ আমরা পাই যখন দেশের অর্থমন্ত্রী সুন্দরবনে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবনের ক্ষতি হবে জেনেও বলেন, আমরা জানি সুন্দরবনের ক্ষতি হবে কিন্তু সেখান থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র সরানো সম্ভব না।

সুন্দরবনের ঠিক পাশেই কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হবে। আর এই বিদ্যুৎকেন্দ্র করবে ভারতের কোম্পানি এনটিপিসি। তার সঙ্গে থাকবে বাংলাদেশের পিডিবি। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে বাংলাদেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। ধ্বংস হবে সুন্দরবন। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে ২২ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড ও ৩১ হাজার টন নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড নির্গমন হবে। টেক্সাসের ফায়েত্তি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বছরে ৩০ হাজার টন সালফার ডাই অক্সাইড নির্গত হত। ফল স্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের হাইওয়ে ২১ এর ৪৮ কিমি জুড়ে গাছপালা ধ্বংস হয়েছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে পশুর নদীর পানি ব্যবহার করা হবে তার ফলে যা ক্ষতি হবে, প্রতি ঘণ্টায় ৯১৫০ ঘনমিটার করে পানি প্রত্যাহার ও ৫১৫০ ঘনমিটার হারে আবার নদীতে ফেরত পাঠানো হবে। যার ফলে দূষিত হবে পশুর নদীর পানি। প্রভাব পড়বে প্রাণি ও উদ্ভিদ জগৎ ও মাছের ওপর। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতির উচ্চ শব্দে শব্দদূষন হবে।  উৎপন্ন ছাই থেকে যে পরিবেশ দূষণ হবে তা বলাই বাহুল্য। (আরও অনেক ক্ষতি হবে যার বিস্তারিত আমরা জাতীয় কমিটির বুকলেটে পাওয়া যাবে। সুবিধার্থে এই লেখার নিচে বুকলেটটি যুক্ত করা হয়েছে)।

CdWDNkyUIAATMTS

বাংলাদেশের মানুষের প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম এই সুন্দরবনকে ধ্বংসের লক্ষ্য থেকেই করা হচ্ছে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র । কেননা এত আন্দোলন, এত ক্ষতি জানা সত্ত্বেও যখন বিদ্যুৎকেন্দ্র করার চক্রান্ত বাস্তবায়ন চলতে থাকে তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, দেশের সরকার ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের তাবেদার এবং এরা সম্প্রসারণবাদী ভারতের লুণ্ঠন নীতির বিরোধিতা করতে পারে না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই দৃঢ়তার সঙ্গেই বলেন, ‘এই বিদ্যুৎকেন্দ্র হবেই’।

সরকারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, এই বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি মোকাবেলা করা যাবে। দেশের উন্নয়ন হবে। একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে সেই দেশের ন্যুনতম ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকতে হয়। আমাদের বাংলাদেশে সেখানে মাত্র ১৩ শতাংশেরও কম বনাঞ্চল রয়েছে। আর এই ১৩% এর একটা বড় অংশ হলো আমাদের সুন্দরবন। এই সুন্দরবনই যদি ধ্বংস হয় তাহলে এত এত উন্নয়ন দিয়ে কী হবে? আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই উন্নয়ন কার স্বার্থে? এটা কি ব্যাপক জনগণের উন্নয়ন? না, অবশ্যই না। এই উন্নয়ন শাসকশ্রেণির উন্নয়ন।

আমরা ফুলবাড়ি আন্দোলনের সময় দেখেছি, সেখানেও ছিল শাসকশ্রেণির উন্নয়ন এর ফিরিস্তি। কিন্তু আমরা জানি যে, ওই ফুলবাড়ি কয়লা খনি যদি হয় তাহলে কী পরিমাণ ক্ষতি জনগণে হতো। লাখ লাখ মানুষ সেখানে উদ্বাস্তু হতো। তাই জনগণ তা প্রতিরোধ করেছেন।

বাংলাদেশের শাসক গোষ্ঠীর উন্নয়ন হলো সাম্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদকে খুশি রাখার কর্মকাণ্ড। এ উন্নয়ন ব্যাপক জনগণের উন্নয়ন নয়। যদি তাই হতো তাহলে আমরা তার নমুনা পেতাম।

সুন্দরবন ধ্বংসের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। আন্দোলন চলছে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে। এর আগে ফুলবাড়ি আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় কমিটি সেখানে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে উন্মুক্ত কয়লা খনির পাঁয়তারা রুখে দিয়েছে। কিন্তু জাতীয় কমিটির এবারের আন্দোলন এবং  জাতীয় কমিটি নিয়েই কিছু প্রশ্ন উঠেছে। একটু গভীরে গিয়ে দেখা যাক, কেন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে জাতীয় কমিটি।

জাতীয় কমিটি একটি জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্য সাধারণ মঞ্চ। এখানে যে কোনও ব্যক্তি ও দল জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন। কিন্তু যারা ক্ষমতায় রয়েছে এবং সরকারের অংশ, আর সে সরকারই এসব গণবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তারা নিশ্চয় এখানে থাকতে পারে না। মজার বিষয় হলো, জাতীয় কমিটিতেই রয়েছে বাংলাদেশের তথাকথিত বাম নামধারী সাম্রাজ্যবাদের দালাল দল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। যার নেতা রাশেদ খান মেনন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ও সরকারের মন্ত্রী পরিষদেও রয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি।

সাধারণভাবেই বোঝা যায় যে, এদেরকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের কর্মকাণ্ডবিরোধী আন্দোলন হতে পারে না। যারা গণবিরোধী সরকারের অংশ তারা কখনই জনগণের বন্ধু হতে পারে না। এরা সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের নামে জনগণকে ধোঁকা দেয়। ফলে জাতীয় কমিটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠছে।

চলতি বছরের ১০-১৩ মার্চ জাতীয় কমিটি একটি লংমার্চ করেছে। যেখানে ওয়ার্কার্স পার্টিও অংশ নিয়েছে। বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের পক্ষ থেকে লংমার্চ পর্যবেক্ষণ ও জনগণের মনোভাব বোঝার জন্য লংমার্চে আমি নিজে অংশ নিয়েছিলাম। বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন সাংগঠনিকভাবে জাতীয় কমিটির সঙ্গে যুক্ত নয়)। এ লংমার্চে বেশ কিছু বিষয় আমার নজর কেড়েছে।

লংমার্চ যখন বিভিন্ন যায়গায় থেমেছে তখন সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছি। তারা বলেছেন, তারা সুন্দরবন ধ্বংস করে বিদ্যুৎকেন্দ্র চান না। কিন্তু সরকারে থাকা বাম দল এই আন্দোলনে থাকায় তারা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নিয়ে। আর লংমার্চের ভেতরেও আন্তরিক কর্মীদের মধ্যে এ  নিয়ে ক্ষোভ দেখেছি। এ কারণেই সমগ্র লংমার্চ জুড়েই ঢিলেঢালা ভাব ছিলো বলে আমার মনে হয়েছে।

জাতীয় কমিটির এই লংমার্চে ছিল ছাত্র ও মধ্যবিত্তদের আধিক্য। সেকারণেই পুরো লংমার্চই পরিচালিত হয়েছে মধ্যবিত্তীয় ভঙ্গিতে। লংমার্চ যখন যশোরে পৌঁছায় তখন পুলিশ সমাবেশ করতে বাঁধা দেয়। জাতীয় কমিটি সেখানে দৃঢ়ভাবে কোনও প্রতিরোধ ও সংগ্রাম করেনি। পূর্ব নির্ধারিত স্থানে সমাবেশ না করে পুলিশের নির্ধারিত স্থানেই করতে হয়েছে সমাবেশ। এছাড়া পুরো লংমার্চে সমাবেশগুলো হয়েছে খুবই সংক্ষিপ্ত। যার ফলে স্থানীয় জনগণ লংমার্চের সঙ্গে একাত্ম হতে পারেনি।

এ পর্যন্ত সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয় কমিটির এ আন্দোলন ব্যাপক জনগণকে নিয়ে কিংবা সংগঠিত করে হচ্ছে না।  ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনও আন্দোলন সফল হতে পারে না, আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে এটুকু জানি আমি। অনেকেই নিশ্চই আমার সঙ্গে একমত হবেন। জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনের ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে আমাদের ফুলবাড়ীর আন্দোলন ও ভারতের  সিঙ্গুর-নন্দিগ্রাম বা লালগড়ের আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সেখানকার জনগণের প্রতিরোধের ধরন ও রাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে যে আন্দোলন জনগণ করেছেন তা থেকে আমাদের শিখতে হবে। জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলন নিশ্চয় আপষ ও খালি দাবি পেশ করার মধ্য দিয়ে হবে না। রাষ্ট্রকে চাপ প্রয়োগ করেই জাতীয় সম্পদ রক্ষায় বাধ্য করতে হবে। ছাত্র-কৃষক-শ্রমিক-মধ্যবিত্ত-বুদ্ধিজীবী সবাইকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা এই রাষ্ট্র প্রতিনিয়তই এধরনের জনবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। সুতরাং আমাদের সমস্যার গভীরেও নজর দিতে হবে। জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনকেও প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র ভেঙ্গে জনগণের রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার সঙ্গে যুক্ত করেই আগাতে করতে হবে। তা না হলে আমরা শোষিত হতেই থাকব। বিপরীতে লক্ষ্য ঠিক রেখে যদি আগাতে পারি তাহলে জনগণের বিজয় অনিবার্য।

লেখক: সহ-আহবায়ক, বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন।

এই মতামত লেখকের একান্ত নিজস্ব। দ্বন্দ্ব ডট কমের সম্পাদকীয় নীতিমালার সঙ্গে এর মিল বা অমিল থাকতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

Latest from রাজনীতি

গো টু টপ