নারী বা পুরুষ নয়, মানুষ হবো কবে?

শারমিন রহমান।।

আমি পুরুষদের ঘৃণা করি। কি, কথাটা শুনে আঁতকে উঠলেন? যে সমাজব্যবস্থায় পরিবারের আপন মানুষদের (পুরুষ) হাতেই রচিত হয় প্রতিটি মেয়ের যৌন নিপীড়নের ইতিহাসের প্রথম ইট,তখন তাদের জন্য ঘৃণা ছাড়া আর কোনও অনুভূতি কি জাগ্রত হতে পারে? রাস্তাঘাটে, ঘরে, বাইরে, সহকর্মী বা সহযোদ্ধা কিংবা আত্মীয় অথবা যেকোন পুরুষই তো প্রতিনিয়ত বাধ্য করে এই ঘৃণাকে উসকে দিতে।সমাজের চোখে নারী ও শিশুরা হলো খেলার পুতুল। তাদের বিশ্বাস যতো সহজে অর্জন করা যায়; তার চেয়েও সহজে তাদেরকে নিপীড়ন করা যায়। কেন? সমাজ শেখায় নিপীড়নের জন্য নারীদের কোন না কোন আচরনই দায়ী, তাই সব কিছু চুপচাপ মেনে নিতে হবে, তা না হলে যাবে সমাজের চোখে তার তথাকথিত “মানসম্মান”।

নারী বা পুরুষ নয়, মানুষ হবো কবে
নারী বা পুরুষ নয়, মানুষ হবো কবে

যখন নারীদের রাস্তাঘাটে উত্যক্ত করা হয়, তারা বাধ্য মাথা নিচু করে রাখতে, মুখ বুজে মেনে নিতে! কেউ যদি মাথা তোলার দুঃসাহস দেখায় তাদেরকে রাস্তায় সবার সামনে বাঁশ দিয়ে পেটানোতো পুরুষের অধিকার, প্রকাশ্যে কোপানো সেই ‘দুঃসাহসী’ নারীর জন্য পুরস্কার। ঘটনার আশে পাশে দাঁড়িয়ে যেসব ‘পুরুষ সিংহ’ সেই দৃশ্য উপভোগ করেন কিংবা হাতের মোবাইল দিয়ে ক্যামেরাম্যান হয়ে ভিডিও রেকর্ড করেন, তারাও এই নিপীড়কের সহযোগিতে পরিণত হন। উৎসাহ দেন এভাবেই আরও বহু নারীকে ‘পুরস্কৃত’ করতে। তো এই যখন পরিস্থিতি তখন এই সমাজ ব্যবস্থা ও তার ধারক পুরুষের মানসিকতাকে ঘৃণা জানানো ছাড়া উপায় কি!

বাসে বা রাস্তায় যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করলেই শুনতে হয়, ‘এতো সমস্যা হলে প্রাইভেট গাড়িতে যান’ কিংবা ‘চুপ থাকেন’। হতবাক হয়ে যাই যখন দেখি বাসে থাকা নারীরাও পুরুষের এমন আচরণ সমর্থন করে। পাবলিক বাসে উঠলে কি নারীর শরীরও পাবলিকের সাধারণ সম্পত্তিতে পরিণত হয়?! যে যেখানে পারে হামলে পড়বে, ধাক্কা দেবে। যদি কেউ কাছে আসার সুযোগ না পায় সে দূরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে।তাদের চোখ আছে, তাকিয়ে থাকা তাদের অধিকারের পর্যায়ে পড়ে!

বাস কিংবা বাসা, রাস্তা কিংবা বাজার সব জায়গাতেই নারীদের উপর এই নিপীড়ন দেখেও না দেখার ভান করে বা চুপ থেকে যে বা যারা (পুরুষ বা মহিলা) নির্যাতনকে উৎসাহ দিয়েছেন, তা-ই আজ পরিনত হয়েছে ‘কোপানোর সংস্কৃতি’তে। নারী, সে হোক ১ বছরের শিশু কিংবা ৮০ বছরের বৃদ্ধ; তার যে রয়েছে শরীর, আর এ শরীর যে পুরুষের কাছে উপভোগের পণ্য মাত্র। যে নারী পুরুষের কথা মতো না চলার স্পর্ধা দেখাবে, তাকে কোপাতে হবে, ধর্ষণ করতে হবে বা নির্যাতন-নিপীড়ন করতে হবে, এসিড মারতে হবে, আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিতে হবে বা ধর্ষণের প্রমাণ মুছতে মেরে ফেলতে হবে। হোক সে বিবাহিত স্ত্রী, চাকরীজীবী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা কিংবা অন্য যে কেউ; শুধু জন্মসূত্রে নারী হলেই চলবে। তাতেই তার ওপর আজন্মের অধিকার পেয়ে যায় পুরুষ।

বিসিএস ক্যাডার সুশান্ত পাল-এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে ২৪ ঘন্টা সময়ও লাগে না সরকারের। অথচ প্রকাশ্যে নার্গিসকে কুপিয়ে মৃতপ্রায় করে ফেলার পরও অপরাধীর সাজা হয় না। অপেক্ষা বিচারের। আর সে বিচার আইনের নানা মারপ্যাঁচে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। এক সময় মানুষ ভুলেই যায়। যৌন নির্যাতনের মামলাতে এতো দীর্ঘসূত্রিতা কেন? সুশান্ত পালের চেয়ে ধর্ষক ও যৌন নিপীড়নকারীরা কি কম দোষী? প্রতিনিয়ত এই নারী ও শিশুর ওপর যে নিপীড়ন হচ্ছে, উন্নয়নের ডামাঢোলের মাঝে কি এটা জাতির জন্য অসম্মানের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় না? দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা যদি একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে একটি দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ, নারী-শিশু যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীন জীবনযাপন করছে, প্রতিদিন খবরের পাতা খুললেই ৪/৫ টা যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ, প্রতিবাদকারী নারীকে ঘরে এসে হত্যার খবর আসে; তাতে কি দেশের বা সমাজের সম্মান যায় না? বর্তমান পরিস্থিতিই জবাব দেয়, এতে এ সমাজ ও সরকারের কিছু যায় আসে না। এতে দেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট হয় না।

৭১-এ পাকিস্তানিরা দেশের কয়েক লক্ষ নারীকে ধর্ষণ করেছিল।সেই অপমানের জবাব দিতে বুকের রক্ত দিয়ে পাকিস্তানীদের বিতাড়িত করেছে আমাদের সূর্য সন্তানেরা। ৭১ পরবর্তী সময়ে কেন আমরা প্রতিনিয়ত লাঞ্চিত, ধর্ষিত হচ্ছি? কেন আজ ও আমরা উপভোগের সামগ্রীই মাত্র, অন্তত তথাকথিত সমাজের চোখে। এমনকি ব্রেস্ট ক্যান্সার এর মতো প্রাণঘাতী রোগের সচেতনতার বিজ্ঞাপনেও নারীর শরীরকে পণ্য হিসেবে হাজির করে এই সমাজব্যবস্থা। প্রাণঘাতী রোগ নিয়েও তারা ব্যবসা করে।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আজ শুধুমাত্র শিশুদের উপর নিপীড়ন সমাজের মানুষকে নাড়া দেয়, কেন? ধর্ষণ বা হত্যা ছাড়া বাকি নির্যাতন তো কানেই নেয় না এই সমাজ।গৃহবধু, কিশোরী মেয়ে, নারীদের নিপীড়নের খবর আজ আর দাগ কাটে না মানুষের মনে।চলতে ফিরতে প্রতিনিয়ত আমরা যে নির্যাতনের স্বীকার হই, নারীদের ছাড়া কোন ছেলের পক্ষে একবারও সেই সীমাহীন মানসিক যন্ত্রনা অনুভব করা সম্ভব? সম্ভব না। তাই শুধু নির্যাতিত নারী বা শিশুর জন্য নয়, সমাজের সবস্তরের নারী ও শিশুর নিরাপত্তার জন্যই আওয়াজ তুলতে হবে আজ।। যে আদিবাসী কিশোরীটি সিএনজি থেকে লাফিয়ে নিজেকে বাঁচালো তার জন্য, যে হিন্দু গৃহবধু ধর্ষণের শিকার হলো তার জন্য। এরকম শত শত নির্যাতিত-নিপীড়িত সবার জন্য একসঙ্গে আওয়াজ তুলতে হবে। সাইফুল বা মিজান বা ধর্ষণের সেঞ্চুরি করে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে মিছিল করে উদযাপনকারী ছাত্রলীগের মানিক (১৯৯৮); যেই হোক সবাইকেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা জরুরি।

তনুর জন্য আওয়াজ তোলা হয়েছিল, হয়েছিল কল্পনা চাকমার জন্যও, কিন্তু ফল কি? এ রাষ্ট্র-সরকার-সমাজ ব্যবস্থা বিচারকে প্রহসনে রূপ দিয়েছে। ধর্ষণে সেঞ্চুরিয়ান মানিক এখন ভাল চাকরি করছে, ধর্ষককে নিরাপত্তা দেয় এই সমাজব্যবস্থা। ধর্ষকরা পুরস্কৃত হয়,ভালো চাকরি পায়। কিন্তু ধর্ষিতা ও নির্যাতিত নারীর জন্য কি করা হয়? জোটে সামাজিক বঞ্চনা, এক ঘরে হয়ে পড়তে হয় তাকে,সাথে তার পুরো পরিবারকে।শারীরিক ক্ষত একসময় মিলিয়ে যায় হয়তো,কিন্তু মনের ক্ষত কি কখনো পূরন হয়, না সমাজ সেই ক্ষত নিরসনের কোন দায়িত্ব নেয়?!

দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল যৌন নির্যাতনবিরোধী নীতিমালা (২০১১) কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের হাত থেকে নারীকে রক্ষা করতে? কতজন যৌন নিপীড়নকারীর বিচার হয়েছে ১ বছরে বা ২ বছর বা ৫ বছরে? স্পষ্ট জানি, এ বিচারের সংখ্যা তথাকথিত উন্নয়নের মতো তরতরিয়ে বাড়ছে না।

এই যখন পরিস্থিতি, তখন কিভাবে, কার কাছে বিচার দাবি করবো আমরা? যখন কোনও ঘটনা নাড়িয়ে দেয় সবাইকে, তখন দেখি প্রধানমন্ত্রী ধর্ষিতার বা নির্যাতিতের হাসপাতালের খরচের দায়িত্ব নেন। শরীরের ক্ষত শুকিয়ে যায়, চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির ফলে হয়ত তার মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব। কিন্তু একজন ধর্ষিতা বা নির্যাতিতের মনের যে ক্ষত, তার মূল্য কত টাকা হবে? পারবে সরকার কোষাগারের সব টাকা দিয়েও সেই ক্ষততে মলম লাগাতে? জানি, পারবে না।

যতদিন না আইন কঠোর হবে ও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হবে, ততদিন নারীদের এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে, নিপীড়নের মহোৎসবের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। দ্রুত কার্যকর বিচারের মাধ্যমে সমাজের সামনে দৃষ্টান্ত উপস্থাপিত না হলে নিপীড়ক পুরুষেরা নিপীড়নে ভয় পাবে না। যদিও এটাই একমাত্র সমাধান নয়। কারণ প্রতিকার যেমন করতে হবে, পাশাপাশি প্রতিরোধও জরুরি। যতক্ষণ পর্যন্ত পুরুষ এবং নারীরা তাদের মনের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবকে ছুড়ে ফেলে মানুষে পরিণত না হচ্ছে, ততক্ষণ নিপীড়ক পুরুষের সহযোগী হয়ে থাকব আমরা সবাই। প্রতিটি নারী ও শিশুদের নিজেদেরই সচেতন হতে হবে, প্রতিবাদে কণ্ঠস্বর জোরালো করতে হবে। আমরা নারীরা আর কতকাল মার খাবো? এখন সময় এসেছে যারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়, তাদের পাল্টা মার দেওয়ার। তা যে কোনও উপায়েই হোক না কেন।

বিসিআইসি কলেজের দুই ছাত্রীকে অভিনন্দন, অভিনন্দন তাদের পিতাকে। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন তার মেয়েদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়। কিন্তু এই প্রতিবাদ শুধু ব্যক্তি কেন্দ্রিক হলে চলবে না, এটাকে পরিণত করতে হবে সমষ্টির প্রতিরোধে। মোড়লগঞ্জের যে শিশুটি নির্যাতনের প্রতিবাদ করেছে, এমনকি যৌন হয়রানির রের্কড করা বক্তব্য থাকার পরও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশীল হওয়ার জন্য অপরাধীর শাস্তি তো দূরের কথা, উল্টো নির্যাতিত সেই শিশুর পরিবারই আজ পুরুষ শাসিত সমাজের চাপে রয়েছে। আমাদেরকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে।নিপীড়ক সে হোক মন্ত্রী, হোক প্রভাবশালী বা যেই হোক, তাকে বিচারের কাঠগড়ায় আমাদেরকেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাড় করাতে হবে।

সব অন্যায়ের প্রতিবাদের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভূমিকাও এই আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমন্ত (জেগে ঘুমানো) প্রশাসনকে জাগাতে হলে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এই আমরা শুধু তারাই যারা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ঊর্ধ্বে ওঠে নিজেদের মানুষ বলে দাবি করি।

সবশেষে বলতে চাই আমরা নারীরা শুধু মাটির মতো নই, আমাদের আগুন হয়ে উঠতে হবে। আগুনের সবগুলো স্ফুলিঙ্গকে একত্রিত করে হয়ে উঠতে হবে দাবানল। পুড়িয়ে দিতে হবে এই ঘুনে ধরা পুরুষশাষিত সমাজ ব্যবস্থাকে। সেদিনই ঘরে বাইরে সবখানে দ্বিধাহীন ভাবে ঘুরে বেড়াতে পারবো আমরা, সব শিশুরা, সব মানুষেরা। সব সময় অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব বয়ে বেড়াতে হবে না আমাদের, নিজেদের পরিচয় নারী বা পুরুষ নয়, হয়ে উঠবে মানুষ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*