বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির দিশারী মহান বিপ্লবী সিরাজ সিকদার

শান্তনু সুমন||

“তোমরা কি দেখেছো পেয়ারাবাগান?

শুনেছো ভিমরুলি, ডুমুরিয়া-

আটঘর-কুড়িয়ানার নাম?”

সিরাজ সিকদার রচিত ‘গণযুদ্ধের পটভূমি’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার লাইন।

এখনকার তরুণদের বিপুল অধিকাংশই পেয়ারাবাগানের মহান সংগ্রাম সম্পর্কে জানেন না। অথচ, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পেয়ারাবাগান জনযুদ্ধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছিল। রূপকথার মতো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সমগ্র বাংলাদেশ ও ভারতে।

এই পেয়ারাবাগানের ইতিহাস জানতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ১৯৭১ সালে সংগঠিত জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের দিকে। জাতীয় মুক্তির সে যুদ্ধ পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশের জনপদের ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল আখ্যানের জন্ম দিয়েছিল। শত শত বছরের শোষণ নিপীড়নের জিঞ্জির ভাঙ্গতে এই জনপদের মানুষ বার বার বিদ্রোহ করেছেন। লড়াই করেছেন। ব্রিটিশ ওপনিবেশিক দস্যুদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে দীর্ঘ দুশো বছর সংগ্রাম করেছেন। কানু-সিধু, সূর্যসেন-প্রীতিলতারা জীবন দিয়ে সে সংগ্রামকে বেগবান করেছিলেন। কিন্তু ’৪৭-এ সেই আত্মত্যাগ ও সংগ্রাম বৃথা গেল। পাকিস্তানি আমলাতান্ত্রিক পুঁজিপতি ও সামন্তবাদী শাসক শ্রেণি ক্ষমতা দখল করল। পূর্ববাংলায় শোষণ-নিপীড়ন নতুন রূপে হাজির হলো। ’৪৮ থেকে ’৭১; ২৩ বছর ধরে চলমান পাকিস্তানি বাইশ পরিবারের জুলুম-নির্যাতন আর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার বীর জনগণ আবার সংগ্রামের জাল বুনলেন। ’৭১-এ রচনা করলেন ইতিহাসের এক অনন্য প্রতিরোধ যুদ্ধ। পাকিস্তানি ওপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে পূর্ববাংলাকে মুক্ত করতে কাতারে-কাতারে জীবন দিলেন মুক্তি পাগল জনগণের সন্তানেরা। পাকবাহিনীর হাতে প্রাণ হারালেন লাখ লাখ মানুষ। ধর্ষিত হলেন আমাদের অগনিত মা-বোন। এ আখ্যানের নাম জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ।

%e0%a6%95%e0%a6%ae%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%a1-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%9c-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a6%a6%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%81%e0%a6%ac%e0%a7%87পাক সামরিক ফ্যাসিস্টরা একাত্তরের ২৫ মার্চের রাতে অতর্কিতে হামলে পড়ল নরীহ নিরস্ত্র মানুষের ওপর। জনগণকে বুলেট আর কামানের মাঝে রেখে আত্মসমর্পণ করলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগের অন্য শীর্ষ নেতৃবৃন্দ পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয় নিলেন ভারতে।

২৬ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক ফ্যাসিস্টরা পূর্ববাংলায় ইতিহাসের নির্মম ও বর্বরতম গণহত্যা শুরু করল। সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে বরিশাল-মাদারীপুর-নরসিংদী-পাবনা-টাঙ্গাইলসহ আটটি ফ্রন্টে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ শুরু করলেন। সিরাজ সিকদার ব্যক্তিগতভাবে বরিশালের পেয়ারাবাগানে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করলেন। প্রায় শূন্য থেকে বিরাট বাহিনী গড়ে উঠলো। প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র দখল হলো। বিস্তীর্ণ মুক্তাঞ্চল গড়ে উঠলো। এখানেই পাকবাহিনীর কামানের গোলার শব্দের মাঝে অসংখ্য জনতার উপস্থিতিতে ৩ জুন ’৭১, পূর্ববাংলার শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক ভূমিকার সমাপ্তি ঘটলো। প্রতিষ্ঠিত হলো পূর্ব বাংলার শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী রাজনৈতিক পার্টি ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’।

খুন করেও থামানো যায় না যাকে সেই তো সিরাজ সিকদার। যেন কমরেড তাহের আজমীর রক্তে লাল সাভারের মাটি নিজের রক্ত দিয়ে আরও পবিত্র করে গেলেন। শ্রমিক-কৃষক নিপীড়িত জাতি ও জনগণের মুক্তি স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে শ্রেণি সংগ্রামে নেতৃত্ব দিলেন আমৃত্যু। প্রমাণ করলেন, কমিউনিস্টরা জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে লড়তে জানে। কেননা, শৃঙ্খল ছাড়া শ্রমিকের হারাবার কিছু নাই, জয় করার জন্য আছে সারা বিশ্ব।

১৯৬৮ সালের ৮ জানুয়ারি এক ঐতিহাসিক থিসিস দিয়ে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে পূর্ববাংলার শ্রমিক আন্দোলনের পথচলা শুরু। সূচিত হলো এদেশের বিপ্লবী সংগ্রামের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়। পাকিস্তানি ওপনিবেশিক শোষকদের হাত থেকে পূর্ববাংলাকে মুক্ত করার পথ দেখালেন সিরাজ সিকদার । প্রণীত হলো একগুচ্ছ সঠিক বৈপ্লবিক লাইন। জনগণের মুক্তির একমাত্র পথ।

১৯৬০-৭০ দশকে আধুনিক শোধনবাদ বিরোধী সংগ্রামে যারা ভূমিকা রেখেছেন তাদের প্রথম সারিতে ছিলেন সিরাজ সিকদার। ৬৮’র থিসিসেই তিনি স্পষ্টভাবে সভাপতি মাও সেতুঙ এর পক্ষ নিয়ে মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেন। ক্রুশ্চেভ চক্রের নেতৃত্বে দেশে দেশে  ‘শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের’ আধুনিক শোধনবাদ জেঁকে বসে। এর বিরুদ্ধে সংগ্রামে সিরাজ সিকদারের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব ভুমিকায় আরও ছিলেন চারু মজুমদার, গণজালো, কায়াপাক্কা প্রমুখ। শ্রমিক শ্রেণির এ অগ্রসর নেতৃবৃন্দ বিপ্লবী মতাদর্শের নতুন ও সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে চেয়্যারম্যান মাওয়ের শিক্ষার সার্বজনীন সত্যকে নিজ দেশের বাস্তবতায় সৃজনশীল উপায়ে প্রয়োগ করেন। এভাবে সিরাজ সিকদার পূর্ববাংলায় সর্বহারা শ্রেণি ও সমগ্র জনগণের মুক্তির আলোকজ্জ্বল মত ও পথের দিশা তৈরি করলেন। এদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সংশোধনবাদের বৃত্ত থেকে বের করে এনে সঠিক পথে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করলেন। এমনই একজন গণনন্দিত অগ্রণী নেতৃত্ব সিরাজ সিকদার। ৬৮ থেকে ৭৪ পর্যন্ত তার রচিত দলিলাদি ও সে সময় সর্বহারা পার্টি কর্তৃক গৃহীত কার্যাবলি বিচার-বিশ্লেষণ করলেই আমরা তার প্রমাণ পাব।

১৯৬৮ সালের ৫ মে। সেদিন ছিল কার্ল মার্কসের জন্মদিন। সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে পূর্ববাংলার শ্রমিক আন্দোলন ঢাকায় অবস্থিত ‘পাকিস্থান কাউন্সিল’-এ সশস্ত্র হামলা চালায়। এদেশের নিপীড়িত জাতি ও জনগণের শত্রু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবেই এই হামলা। পাকিস্থানি শোসকদের বিরুদ্ধে জনগণের প্রথম সংগঠিত হামলা। এর পরই জনগণের ক্ষমতা দখলে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাওয়ের কৌশল সম্পর্কে ভ্রাতৃপ্রতীম পার্টি কমরেডদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য সিরাজ সিকদার মিয়ানমারে যান। সেখান থেকে ফিরে জনগণের সংগ্রামের ঘাঁটি গড়ে তুলতে পাহাড় অঞ্চলের বাস্তবতা পরীক্ষা করতে পার্বত্য এলাকায় যান। পাহাড়ি এলাকার জনশূন্য পরিস্থিতি বিচার করে বিশেষভাবে পার্বত্য এলাকায় কাজ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। এরপরই আসন্ন হয়ে উঠে ঊনসত্তর এর গণঅভ্যুত্থান। তিনি বুঝতে পারেন জনগণের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্থানি শাসকদের বিরুদ্ধে জমানো ক্ষোভ বিস্ফোরণম্মুখ হয়ে আছে।

নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের কথা মাথায় রেখে পূর্ববাংলার শ্রমিক আন্দোলন এর ২য় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে, ৮ জানুয়ারি, ১৯৭০ সালে সর্বপ্রথম দেশের বিভিন্ন স্থানে জাতীয় পতাকা ওড়ানো হয়। এর মধ্যে ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও ময়মনসিংহ অন্যতম। পূর্ববাংলার নরম্যান বেথুন খ্যাত তাহের আজমীর নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলনের কর্মীরা পতাকার ডিজাইন করেন। ডিজাইনে সবুজ জমিনের মাঝে রক্ত লাল সূর্য, সুর্যের মাঝে তিনটি মশাল তিন সংখ্যালঘুর প্রতিনিধিত্ব হিসাবে রাখা হয়েছিল। যার মধ্যে ছিল জাতিগত, ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু। ক্ষমতায় এসে আওয়ামীলীগ সরকার মূল নকশার মশাল তিনটি বাদ দিয়ে এই পতাকাকেই জাতীয় পতাকা হিসেবে নেয়। আর চাপা দেয় এর প্রকৃত ইতিহাসকে।

ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের তাঁবেদার গণবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকারের দুঃশাসনের প্রতিবাদে সিরাজ সিকদার ১৯৭৪ সালের ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর সারা দেশে অর্ধদিবস হরতাল আহবান করেন। দেশব্যাপী তা জনগণের অভূতপূর্ব সমর্থন লাভ করে। জনগণ স্বতঃস্ফুর্তভাবে হরতাল পালন করেন। অনেক স্থানে গাছ কেটে বেরিকেড দেওয়া হয় এবং জনগণের অংশ গ্রহণে হরতাল সশস্ত্র রূপ লাভ করে। মাওলানা ভাসানীও টাঙ্গাইল থেকে এক বিবৃতির মাধ্যমে হরতালকে সমর্থন করেন। সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাসে জাতীয় ভিত্তিক সংগ্রামের সম্মিলনের এক অনন্য ঘটনা রূপ পায়। মাওবাদী গণযুদ্ধ এক অতুলনীয় উচ্চতায় পৌঁছে। যে উচ্চতাকে পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে আর কখনও স্পর্শ করা যায়নি।

১৯৭১ সালে দীর্ঘায়িত হতে যাওয়া প্রতিরোধ যুদ্ধকে নিজেদের হস্তগত করতে ভারত ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বিভিন্ন রকম কৌশল হাতে নেয়। এর অংশ হিসেবে মিত্র বাহিনী গঠন করে। মূল উদ্দেশ্য ছিল কমিউনিস্টদের হত্যা করা। মুজিব বাহিনীও সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা পার্টি ত্রি-মূখী (পাক সামরিক ফ্যাসিস্ট, আওয়ামী মুজিব বাহিনী ও মিত্রবাহিনী নামে ভারতীয় বাহিনী) আক্রমণের মুখোমুখি হন। এভাবে ব্যাপক-দমন নিপীড়নের মুখে পেয়ারাবাগান থেকে সরে এসে দেশব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী গণযুদ্ধ পরিচালনার প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ নেন। জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ শক্তিশালী হতে থাকলে পাকিস্থানি ফ্যাসিস্টরা পিছপা হতে শুরু করে। ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশনায় পরিচালিত ভারতীয় বাহিনীর নেতৃত্বাধীন মিত্রবাহিনীর কাছে ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করে। দৃশ্যত এই ১৬ ডিসেম্বর পাক-বাহিনীর কাছ থেকে মুক্ত হলেও কার্যত তা পিন্ডির গোলামি ও শোষণের হাত থেকে দিল্লির গোলামি ও শোষণের হাতে জনগণকে নতুন শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। সিরাজ সিকদার এই সত্য উপলদ্ধি করতে সময় নেননি। ’৭২ সালের জানুয়ারিতে তিনি নব গঠিত বাংলাদেশ সরকারের উদেশে খোলা চিঠি লিখেন। সেখানে তিনি ভারতীয় সব হস্তক্ষেপ বন্ধ ও ভারতের সেনাবাহিনী ফেরত পাঠানো, ভূমি পুনর্বন্টন ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক নীতি সমূহ বাস্তবায়নের আহবান জানান মুজিব সরকারের প্রতি। কিন্তু মুজিব সরকার সেসবের তোয়াক্কা না করে বরং ইন্দিরা গান্ধীকেই দেশে ডেকে আনে। মার্চেই সিরাজ সিকদার সর্বপ্রথম সাহসের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির স্বপ্নকে পদদলিত করা হয়েছে; লক্ষ লক্ষ প্রাণদান ও মা-বোনের সম্ভ্রমের সাথে বেঈমানি ও বিশ্বাসঘাতকতা করে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ক্ষমতার লোভে মীর্জাফর যেভাবে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যাকে ব্রিটিশ দস্যূদের হাতে তুলে দিয়েছিল সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করে বাংলাদেশকে তুলে দেয়া হয়েছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের হাতে।’

মার্চের ২য় সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরে আসলে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে প্রশ্ন তুলেছেন এভাবে- ‘আপনার সেনাবাহিনী মিত্রবাহিনী। কিন্তু মিত্র বাহিনী কিভাবে পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের কয়েকশত কোটি টাকার অস্ত্র-যুদ্ধ সরঞ্জাম ভারতে নিয়ে গেল, পূর্ববাংলার বহু কলকারখানা, তার খুচরো অংশ, গাড়ী, উৎপাদিত পণ্য, পাট, চা, চামড়া, স্বর্ণ, রৌপ্য ভারতে পাচার করল?’

আরও প্রশ্ন তোলেন ‘আপনি নিজেকে মুক্তি সংগ্রামের বন্ধু বলে জাহির করেন। কিন্তু নাগা, মিজো, কাশ্মিরি, শিখদের মুক্তি সংগ্রামকে কেন ফ্যাসিবাদী উপায়ে দমন করছেন?’!

১৯৭১-৭২ এ আবারও বাংলাদেশের জনগণ নতুন করে অবরুদ্ধ হলে দৃঢ়তার সঙ্গে মুক্তির পথ বাতলে দেন সিরাজ সিকদার। আহ্বান জানান, ‘পূর্ববাংলার বীর জনগণ, আমাদের সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি, পূর্ববাংলার অসমাপ্ত জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার মহান সংগ্রাম চালিয়ে যান!’ এই শিরোনামে এক গভীর বিশ্লেষণাত্মক রাজনৈতিক দলিল জনগণের মধ্যে প্রচার করেন। অতি দ্রুতই ‘আওয়ামী স্বাধীনতা’র স্বরূপ উম্মোচিত হয়। নতুন রাষ্ট্র ও সমাজের গতি-প্রকৃতিতে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই সিরাজ সিকদারের মূল্যায়ন সঠিক বলে প্রমাণ হতে শুরু করে।

১৯৭৩-৭৪ সালে রুশ-ভারতের দালাল আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে প্রায় দেশব্যাপী সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে উঠে। গণবিরোধী রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ বিস্তৃত হতে থাকে। জায়গায় জায়গায় জনগণের বাহিনী কর্তৃক থানা ফাঁড়ি ঘেরাও দখল হতে শুরু করে। জনগণের ক্ষমতার ঘাঁটি এলাকা গড়ে তোলার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ২৫০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে গেরিলা অঞ্চল গড়ে ওঠে ও গড়ে ওঠে কোম্পানি আকার ও স্তরের নিয়মিত বাহিনী।

১৯৭৪ সালের বন্যা এবং খরায় বাংলাদেশের মানুষ খাদ্য সংকটে পড়েন। সিরাজ সিকদার সংক্ষেপে তীক্ষ্ম ভাষায় এ বন্যা-খরা-খাদ্য সমস্যার কারণ বিশ্লেষণ করেন। পরিষ্কার করে তোলেন, জনগণের এ ভোগান্তির মূল কারণ দেশের গণবিরোধী শাসক শ্রেণি ও সরকার এবং  ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে সম্প্রসারণবাদী ভারত এ দেশের ওপর বন্যা ও খরা চাপিয়ে দিচ্ছে। বলেন, ‘গণসরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের আত্মনির্ভরতার ভিত্তিতেই কেবল এর সমাধান সম্ভব।’

খাদ্য শস্যের দামের ঊর্ধ্বগতি জনজীবনকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে। আওয়ামী সরকার এই খাদ্য সংকট ও সমস্যা সমাধানের যথাযথ উদ্যোগ নিতে অক্ষমতা প্রমাণ করে। রুশ-ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত থাকে। জনগণ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হন। অগণিত মানুষ খেতে না পেরে মৃত্যু বরণ করেন। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের তাঁবেদার গণবিচ্ছিন্ন আওয়ামী সরকারের দুঃশাসনের প্রতিবাদে সিরাজ সিকদার ১৯৭৪ সালের ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বর সারা দেশে অর্ধদিবস হরতাল আহবান করেন। দেশব্যাপী তা জনগণের অভূতপূর্ব সমর্থন লাভ করে। জনগণ স্বতঃস্ফুর্তভাবে হরতাল পালন করেন। অনেক স্থানে গাছ কেটে বেরিকেড দেওয়া হয় এবং জনগণের অংশ গ্রহণে হরতাল সশস্ত্র রূপ লাভ করে। মাওলানা ভাসানীও টাঙ্গাইল থেকে এক বিবৃতির মাধ্যমে হরতালকে সমর্থন করেন। সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাসে জাতীয় ভিত্তিক সংগ্রামের সম্মিলনের এক অনন্য ঘটনা রূপ পায়। মাওবাদী গণযুদ্ধ এক অতুলনীয় উচ্চতায় পৌঁছে। যে উচ্চতাকে পূর্ববাংলা তথা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে আর কখনও স্পর্শ করা যায়নি।

সশস্ত্র সংগ্রামের বিকাশ ও হরতালে ব্যাপক গণজাগরণ আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের রাতের ঘুম হারাম করে দেয়। তারা ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। সিরাজ সিকদারকে গ্রেফতারের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার হণ্যে হয়ে পড়ে। ১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি সিরাজ সিকদারকে চট্টগ্রামের হালিশহর থেকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের নামে অবর্ননীয় নির্যাতন করে সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে গুলি করে হত্যা করে। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। নিজেদের পুতুল পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান শেখ মুজিব চিৎকার করে ফ্যাসিষ্ট চেহারাকে নগ্ন করেছিলেন। হুঙ্কার দিয়ে বর্বরতা ঘোষণা করেছিলেন, ‘কোথায় আজ সিরাজ সিকদার’।

সিরাজ সিকদারের মৃত্যুতে সমগ্র দেশ গভীর শোক ও হতাশায় নিমজ্জিত হয়। এই সেই সাভার, যেখানে কমরেড তাহের আজমীকে বন্ধুত্বের কথা বলে ডেকে এনে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করেছিল সংশোধনবাদীরা। সিরাজ সিকদার প্রিয় কমরেডর আত্মত্যাগকে স্মরণ করে লিখেছিলেন ‘সাভারের লাল মাটি’ নামে একটি কবিতা-

‘সাভারের লাল মাটি

আরো লাল হলো-

তোমাদের পবিত্র রক্তে। ’

খুন করেও থামানো যায় না যাকে সেই তো সিরাজ সিকদার। যেন কমরেড তাহের আজমীর রক্তে লাল সাভারের মাটি নিজের রক্ত দিয়ে আরও পবিত্র করে গেলেন। শ্রমিক-কৃষক নিপীড়িত জাতি ও জনগণের মুক্তি স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে শ্রেণি সংগ্রামে নেতৃত্ব দিলেন আমৃত্যু। প্রমাণ করলেন, কমিউনিস্টরা জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে লড়তে জানে। কেননা, শৃঙ্খল ছাড়া শ্রমিকের হারাবার কিছু নাই, জয় করার জন্য আছে সারা বিশ্ব। শোষণের রাজ্যে আজ দিন যত যাচ্ছে তত বেশি বাড়ছে শ্রমিক শ্রেণি ও নিপীড়িত জনগণের সংগ্রামে সিরাজ সিকদারের অনিবার্যতা। আজ সিরাজ সিকদার মানে হলো তাঁবেদার নিপীড়কের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রক্ত চোখ গুড়িয়ে দেওয়া টান টান শিরদাড়া। জনতার রক্তচোষা জালিমের রক্ত হিম করা মুর্তিমান আতঙ্কের নাম।

ষাট ও সত্তর দশকের উত্তাল দিনগুলো এখন সাক্ষ্য দেয়- বিপ্লব, মতাদর্শ, রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণের প্রশ্নে সিরাজ সিকাদার অন্য সকলকে ছাড়িয়ে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। জাতি ও জনগণের গভীর সংকটের কালে তিনি সঠিক রাজনৈতিক রণনীতি হাজির করেছিলেন। অবলম্বন করেছিলেন বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উদ্ভাবনী কৌশল। ৪২ বছর পিছনে ফিরে তাকালেই বোঝা যায় কী ভীষণ বিচক্ষণ ও দূরদর্শি ছিলেন সিরাজ সিকদার। আর তা সম্ভব হয়েছিল তাঁর চিন্তা পদ্ধতির মধ্যে মার্কসবাদকে সঠিকভাবে অনুধাবন ও তা প্রয়োগে সৃজনশীল হওয়ার ফলেই। সঙ্গে অবশ্যই ছিল মার্কসবাদের অগ্রগতিকে ধরতে পারার দারুণ দক্ষতা। চিন্তাপদ্ধতিতে বিকাশমান মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদী মতাদর্শ রপ্ত ও প্রয়োগের কারণেও ছিল তা অনন্য।

সব ধরনের বিপ্লবী সংগ্রাম তার বিকাশের প্রক্রিয়ায় সংগ্রামের নেতৃত্বদায়ী শ্রমিক শ্রেণি ও শ্রেণি স্বার্থের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য এক ঝাঁক নেতৃত্বের জন্ম দেয়। যে নেতৃত্বের কেন্দ্রে থাকেন একজন, প্রধান নেতৃত্ব। সংগ্রাম বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এ প্রধান নেতৃত্ব চিন্তা ও কর্মপদ্ধতিতে বিকশিত হন সমগ্র সংগ্রামের কর্তৃত্ব হিসেবে। শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণের মুক্তির সংগ্রামে এই নেতৃত্বদায়ী চিন্তা ও কর্মপদ্ধতির ভিত্তি থেকে বিযুক্ত হলে সংগ্রামে ব্যর্থতা অনিবার্য। আর, আমাদের দেশের বাস্তবতা, ঐতিহাসিক প্রয়োজন ও প্রযোজ্যতায় শ্রমিক শ্রেণি ও জনগণের সংগ্রামে সিরাজ সিকদার সেই কর্তৃত্বস্থানীয় নেতৃত্ব হিসেবেই বিকশিত হয়েছিলেন।

সুতরাং, আজকের দিনে যে কেউ বিপ্লবের প্রশ্নে আন্তরিক হলে তার উচিত হবে এ জনপদের জনগণের সংগ্রামের একটি নির্মোহ বিচার বিশ্লেষণ করা। কার উত্তারাধিকারকে বহন করবে তার মীমাংসা করা। কেননা পূর্বের অগ্রগতিকে ধারণ না করে কোন বিজ্ঞান বা কোন সংগ্রাম সামনে এগিয়ে যেতে পারে না। পেছনের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করা যায় না। জনগণের মুক্তির সংগ্রামে পূর্বপরুষদের সর্বোচ্চ অগ্রগতিকে চিহ্নিত করে তা ধারণ করতে না পারলে আমরাও সংগ্রামকে সামনে এগিয়ে নিতে পারব না। কমিউনিস্ট আন্দোলনে বিদ্যমান ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা অতিক্রমেও ব্যর্থ হব।

 

লেখক: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় গণতান্ত্রিক গণমঞ্চ

২৮ ডিসেম্বর, ২০১৬

1 Comment

  1. পড়লাম মনোযোগ দিয়ে। কমরেড সিরাজ অবশ্যই মহান এবং গুরুত্বপূর্ণ।তবে অন্যদের বিশেষত পিকিংপন্থী কমিউনিষ্টদের অবদান,আত্মদানকে এড়িয়ে গেলে চলবে না।কমরেড সিরাজকে এখন বড়ো বেশী প্রয়োজন।তার মৃত্যু বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য অপূরনীয় ক্ষতি। এর বদলা নিতেই হবে।তবে সিরাজ সিকদারের অনুসারীরা এখন বড্ডবেশী ক্ষুদ্র গোষ্ঠী স্বার্থের বেড়াজালে আবদ্ধ। লাল সালাম কমরেড সিরাজ সিকদার।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*