গার্মেন্টস শ্রমিকের খাঁটুনি বেড়েছে দ্বিগুণ, মজুরি কমেছে প্রায় ৬০০ টাকা

সুজিত সরকার।।

১৯৯২ সালে বাংলাদেশের ১,৫৩৭টি গার্মেন্টস কারখানার ৮ লাখ শ্রমিকের নূন্যতম মজুরি ছিল ১,৬৬২ টাকা। ২৩ বছর পর, আনুপাতিক হারে কারখানার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় তিন গুণ, শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে পাঁচ গুণ এবং পরিশ্রমের মাত্রা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। কিন্তু নিম্নতম মজুরি, ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতি ও জীবনমানের উন্নতি বিবেচনায়, কমেছে শ্রমিক প্রতি অন্তত ৬০০ টাকা।

বাংলাদেশের পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশে মোট কারখানার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩২৮টি। ওই অর্থবছরে, পোশাক কারখানাগুলোর সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ লাখ।  ২৩ বছর আগে, ১৯৯২ সালে, অর্থাৎ চলমান ‘গণতান্ত্রিক যুগের অঙ্কুরকালে’ ১ হাজার ৫৩৭টি কারখানায় কর্মরত ছিল ৮ লাখ শ্রমিক। ওই সময় বাংলাদেশ সরকারের শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতি শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি ছিল ১ হাজার ৬৬২ টাকা।

 

গার্মেন্ট শ্রমিকের খাঁটুনি বেড়েছে দ্বিগুণ, মজুরি কমেছে প্রায় ৬০০ টাকা: ছবি ঢাকা ট্রিবিউন
গার্মেন্ট শ্রমিকের খাঁটুনি বেড়েছে দ্বিগুণ, মজুরি কমেছে প্রায় ৬০০ টাকা: ছবি ঢাকা ট্রিবিউন

 

‘গণতন্ত্র পুণরুদ্ধারের’ ২৫ বছরের ধারাবাহিকতায়, বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা নির্ধারণ করে। এই মজুরি কাঠামো আরোপ করার পর, অনেক কারখানায় শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়। অ্যাসিস্ট্যান্ট অপারেটরের পদ বাদ দিয়ে অপারেটর এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট অপারেটরের কাজ একীভূত করা হয়। একইভাবে অনেক সহকারীর পদ বাতিল করে এক ব্যক্তি দিয়ে উভয় পদের কাজ করিয়ে নেওয়া চালু হয়। দুই শ্রমিকের বদলে এক শ্রমিক খাটিয়ে তাকে দেওয়া হয় ৫ হাজার ৩০০ টাকা মজুরি।

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইউনুস ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধ্বসের পর, গার্ডিয়ান পত্রিকায় একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের শ্রমিকদের বেতন ঘন্টায় ১৯.৭৫ টাকা (১ ডলারের দাম গড় ৭৯ টাকায় হিসাব করলে)”। তার প্রতিবেদনে এটা উল্লেখ ছিল না যে, বাংলাদেশের শ্রমিকদের সাধারণ কর্মঘন্টা দৈনিক ১০ ঘন্টা এবং তাদের বেতন ঘন্টায় হিসাব করা হয় না। সঙ্গে, বাধ্যতামূলক ওভারটাইম, সাপ্তাহিক ছুটিত বাতিল, ট্রেড ইউনিয়নে নিরুৎসাহপ্রদান-ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানাবিধ অগণতান্ত্রিক আচরণ রয়েছে নিত্য।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র তথ্যমতে, গত ২৩ বছরের গড় মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, কোনও পণ্যের দাম যদি ২৩ বছর আগে ১০০ টাকা হয়ে থাকে, তবে প্রতিবছর সেই পণ্যের দাম বেড়েছে ৬ টাকা। তেইশ যার পরিমাণ দাঁড়ায় ২৩৮ টাকা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গড় মূল্যস্ফীতির সরাসরি কোনও উল্লেখ নেই, আছে গত ২৩ বছরের মূল্যস্ফীতির একটি চিত্রলেখ (গ্রাফ) পরিসংখ্যান। পাশাপাশি, জীবনমানের উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের কারণে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি – ইত্যাদি বিষয়াদিও একটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

গড় মূল্যস্ফীতি বছরে ৬ শতাংশ ধরে একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের ১৯৯২ সালের ১ হাজার ৬৬২ টাকা মজুরি ২৩ বছর পর দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯০০ টাকা। অথচ, আজকে বাংলাদেশে একজন শ্রমিকের নূন্যতম মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা। একজন শ্রমিক ১৯৯২ সালে যে মজুরি পেত, আজ পায় তার থেকে ৬০০ টাকা কম। কিন্তু কাজ করতে হয় সাড়ে তিন গুণ বেশি। এখানে আধুনিক যন্ত্রপাতির একটা অবদান আছে বটে, তবে অর্থনীতি বলে মূলধনী যন্ত্রপাতি যত বাড়বে, শোষণের মাত্রা ততই বাড়বে।

তবে, এই হিসাবে অন্যান্য খরচ আমলে নেওয়া হয়নি। যেমন বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন খরচ, ইত্যাদি। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৬, দৈনিক প্রথম আলো-র এক প্রতিবেদনে বলা হয় গত ২৫ বছরে ঢাকা শহরে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৩৮৮ শতাংশ – অর্থাৎ প্রায় ৪ গুণ। ঢাকা শহরের পার্শ্ববর্তী শ্রমিক প্রধান এলাকা– যেমন গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়ায় – বাড়িভাড়া বৃদ্ধির কোনও সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে ঢাকার পাশে হওয়ায় খুব বেশি পার্থক্য থাকার কথাও নয়। আওয়ামী লীগের এক আমলেই, ২০১৫ সালে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ৬ বার। গ্যাসের দাম বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। সামনে আরেক দফা মূল্যবৃদ্ধি হতে পারে। এসব বিবেচনায় আনলে, ১৯৯২ সালের তুলনায় ২০১৫’র মজুরি তফাৎ ৬০০ টাকার থেকেও অনেক বেশি, যা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে আরও অনেক তথ্য দরকার।

২০১৩ সালে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ, সিপিডি, এক শ্রমিক পরিবারের ন্যূনতম মাসিক খরচ ১৭ হাজার ৮০০ টাকা উল্লেখ করে প্রতি শ্রমিকের নূন্যতম মজুরি ৮ হাজার ২০০ টাকা প্রস্তাব করে। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে নির্ণয় করা এই প্রস্তাবনায় আয়-ব্যায়, জীবনমানের খরচ এবং দৈনন্দিন খাদ্যমানের বিষয়াদি আমলে নিয়ে নূন্যতম মজুরি প্রস্তাব করে সিপিডি। সংস্থাটির সহকারী গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম উল্লেখ করেছিলেন, “জীবনযাপন করতে শ্রমিকের যে ন্যূনতম মজুরি দরকার ‍আর মজুরি কাঠামোতে তার যে মজুরি রয়েছে – তার মাঝে আছে বিস্তর ফারাক।”

বিজিএমইএ-র তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের ১ হাজার ৫৩৭টি কারখানায় ১ হাজার ৪৪৫ মিলিয়ন ডলারের পোশাক উৎপাদন করত। অর্থাৎ প্রতি শ্রমিক গড়ে বছরে ১ হাজার ৮০৬ ডলার মূল্যের পোশাক উৎপাদন করত। ডলারের বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিলে, গত ২৩ বছরে ১ হাজার ৮০৬ ডলারের ২০১৫ মূল্যমান দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫০ ডলার। ২৩ বছর পর, ৪ হাজার ৩২৮টি কারখানার ৪০ লাখ শ্রমিক উৎপাদন করে বছরে ২৫ হাজার ৯৪১ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক। অর্থাৎ, প্রতি শ্রমিক গড়ে বছরে উৎপাদন করে ৬ হাজার ৩৭২ ডলারের পোশাক। যা ১৯৯২ সালের তুলনায় ২ গুণ বেশি।

“স্বাধীন গণতান্ত্রিক যুগের” পরিণতিতে শ্রমিকদের নিয়তি হল এই যে, তাকে সাড়ে তিন গুণ বেশি কাজ করতে হয় ৬০০ টাকা কম মজুরিতে। আর, মজুরি বৃদ্ধির দাবি নিয়ে রাস্তায় নামলে হারাতে হয় চাকুরি, খেতে হয় লাঠি-গুলি-টিয়ার গ্যাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

Latest from অর্থনীতি

গো টু টপ