রাজনৈতিকভাবে সচেতন হোন, জয় অনিবার্য

সুজিত সরকার।।

কোটা সংস্কারের আন্দোলন শুরু থেকেই সুস্পষ্টভাবে রাজনীতি থেকে পার্থক্য টেনে চলা একটি আন্দোলন। এর ধারাবাহিকতায় দমন-পীড়নের মুখে পড়লেও রাজনীতি থেকে এই  আন্দোলন ও নেতাকর্মীরা সচেতনভাবে দূরত্ব বজায় রেখে চলেছেন। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন, আগস্টের সেনাবিরোধী আন্দোলনসহ অতীত অভিজ্ঞতা বলে, রাজনীতি দ্বারা চালিত আন্দোলন বাধার মুখে পোড় খায়, কর্মসূচী হয় উচ্চ থেকে উচ্চতর। এর বিপরীতে, রাজনীতি-বিমুখ কোটা সংস্কারের আন্দোলন বাধা, দমন-পীড়নের মুখে পড়ে পণ্ড হওয়ার পথে।

রাশেদসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দরা রাজবন্দি হওয়ার সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক ধরপাকড় ও অত্যাচারের মধ্য দিয়ে কোটা সংস্কারের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন যখন পরিষ্কারভাবে রাজনৈতিক পথে হাঁটা শুরু করলো, তখনও আন্দোলনে সম্পৃক্ত অবশিষ্ট নেতাকর্মীরা রাজনীতি থেকে দূরে অবস্থান নিয়ে পৃথক থেকে আন্দোলন পরিচালনা করার সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন। কেন রাজবন্দি, কেন অত্যাচার বা কেন ধরপাকড়­— এই তীরগুলো তারা সরকার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বরাবর ছোঁড়েননি। ফলে, রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে, ধরপাকড় ও অত্যাচার বন্ধের দাবিতে উচ্চতর কর্মসূচী দেওয়া সম্ভব হয়নি। প্রধান নেতৃবৃন্দদের স্থলে গড়ে ওঠেনি নতুন নেতৃত্ব। আর বন্ধ হয়নি ধরপাকড় ও অত্যাচার।

MG_1548

এর ফলাফলে, যদিওবা আগামীতে নির্বাচনে জনপ্রিয়তা অর্জন করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার কোটা কিছুটা হলেও সংস্কার করে, তাতে বদলাবে না রাশেদ-নূর কিংবা অন্যান্য আন্দোলনকারীদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ। এদের সরকারি চাকরি তো দূরের কথা, কোন চাকরি হয় কিনা, তা নিয়েই এখন সংশয়। আর রাজনৈতিকভাবে অসংগঠিত ছাত্রসমাজ ভবিষ্যতে অন্য কোনও ন্যায্য দাবি নিয়ে এগিয়ে যেতেও পিছপা হবে।

এই আন্দোলন থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিষয়টি হলো, সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজনীতিকে গ্রহণ করতে এখনও প্রস্তুত নয়। বিকল্প কোনও রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও স্বীকার করতে রাজি নয়। এটা তাদের দোষ নয়, সীমাবদ্ধতা। গত ২৮ বছর ধরে ধীরে ধীরে সমাজ থেকে রাজনীতি বিযুক্তিকরণ যে প্রক্রিয়া চলেছে, তারা সেই সমাজের সন্তান। গত ২৮ বছর ধরে যে সমাজে সচেতন ধারাকে ধারাবাহিক অত্যাচার, নিষ্পেষণ, জোর-জুলুম থেকে শুরু করে গুম-খুন-হত্যা করে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে, তারা সেই সমাজেই বসবাস করে। গত ২৮ বছর ধরে তাদের চোখের সামনেই ক্ষমতার পালা-বদলের রাজনীতি পরিণত হয়েছে দুর্নীতি, গুণ্ডামি আর নোংরামির আখড়ায়।

এরই মাঝে, ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অগ্রণী ভূমিকা রাখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান দৈন্যতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ৮০’র দশকে সামরিক শাসক এরশাদ যে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার ঘোষণা করেছিল, ’৯০র গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ছাত্র সংসদ অকার্যকর করে রাখা, ক্ষমতাবান ছাত্র সংগঠনের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা, আর গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ধারার রাজনীতিকে কঠোরভাবে প্রতিহত করাসহ ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বিযুক্তিকরণ কর্মসূচী ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে রাজনীতি বিযুক্তিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে মডেল স্থাপন করেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ধীরে ধীরে সেই পথেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে গত দশক ধরে। এটাই ছিল বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে ২০০৬ সালে রচিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিচালনা করার দীর্ঘমেয়াদী কৌশলপত্রের অন্যতম লক্ষ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি বিযুক্তিকরণ প্রক্রিয়া মূলত গোটা সমাজটাকে রাজনীতি বিযুক্তিকরণ করার পন্থা। রাজনীতি বিযুক্ত সমাজ নির্মাণের কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময়েই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনৈতিক দিক নির্দেশিত আন্দোলনগুলো সমাজে সঞ্চারিত হয়েছে, গণজাগরণ সৃষ্টি করেছে এবং উদাহরণ রেখে গেছে।

রাজনৈতিকভাবে অধিকার সচেতন হওয়াটাই তাই সমাধান। আর এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা তাই রাখতে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধরাণ শিক্ষার্থীদের। তাদের যেরকম রাজনৈতিকভাবে ছাত্র-অধিকার বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠতে হবে, একইভাবে সচেতন হয়ে উঠতে হবে সমাজ-অধিকার সম্পর্কে। রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়া ছাড়া যে সত্যিকার অর্থে দাবি আদায় করা সম্ভব না, তা সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে একেবারে স্পষ্ট।

রাজনৈতিকভাবে ব্যখ্যা করতে পারাটা সামগ্রিকতাকে দেখতে পারা। কোটা সংস্কারের আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে ব্যখ্যা করতে পারলে শিক্ষার্থীরা অবশ্যই একে সামগ্রিকভাবে ব্যখ্যা করতে পারবেন; এর পেছনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা স্বার্থসিদ্ধি অনুধাবন করতে পারবেন। তারা বুঝতে পারবেন, আদতে যে ‘রাজনীতিমুক্ত‘ কোটা সংস্কারের আন্দোলন করতে চেয়েছেন, তা কোনোভাবেই রাজনীতি বিযুক্ত একটি বিষয় নয়।  আর আন্দোলন সবসময়েই সরকার বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে রচিত হয়, ন্যায্য দাবি নিয়ে। ‍সরকারবিরোধী বা কর্তৃপক্ষবিরোধী কর্মসূচী দোষের কিছু নয়, অত্যন্ত ন্যায্য। ইতিহাসে তখনই আন্দোলন রচিত হয়েছে, যখন ক্ষমতাসীনরা অধীনে থাকা সাধারণের সাথে অন্যায় করেছে।

এই সামগ্রিকতাকে যখন আপনারা অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন, তখন ক্ষমতাসীনদের ফাঁপা আশ্বাসের পেছনে লুকিয়ে থাকা ডাণ্ডাটাও আপনারা দেখতে পারবেন। যখন সেই ডাণ্ডার মোকাবিলা করতে আপনারা পারবেন, তখন নিশ্চই জয় আপনাদেরই। তাই, এখন, এই মুহুর্তে, প্রথম প্রয়োজন আপনাদের নিজেদের চিন্তাকে রাজনৈতিকভাবে সজ্জিত করা।

লেখক: রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

*

Latest from রাজনীতি

গো টু টপ